ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের

নোট অব ডিসেন্টে বিএনপির স্বৈরাচারী মানসিকতার ইঙ্গিত

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৫, ১১:১০ পিএম

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, বিএনপি জুলাই সনদের যেসব ধারা নিয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, তা তাদের ভেতরে থাকা স্বৈরাচারী চিন্তাভাবনারই বহিঃপ্রকাশ।

রোববার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলের একটি অডিটোরিয়ামে জামায়াতে ইসলাম আয়োজিত ‘ফ্যাসিবাদের কালো থাবা ও আগামীর বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন তিনি।

তাহের বলেন, বিএনপি আজ যে পথে হাঁটছে, তাতে বোঝা যায় তারা গণতন্ত্রের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতিকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নোট অব ডিসেন্টের মাধ্যমে তারা এমন কিছু ধারার বিরোধিতা করেছে, যা স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পুনরুত্থান ঠেকাতে সাহায্য করত। তাদের এই অবস্থানই প্রমাণ করে যে, ভিতরে ভিতরে তারা আবারও একদলীয় মানসিকতায় ফিরে যেতে চাইছে।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, জুলাই সনদ স্বাক্ষরের দিন বিএনপি ও জামায়াতসহ ৩১টি রাজনৈতিক দল সংস্কারভিত্তিক ঐক্যমতের ভিত্তিতে ঐতিহাসিক এক অবস্থানে পৌঁছেছিল। 

তাহের বলেন, সেদিন বিএনপির নেতারা হাসিমুখে, পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে সই করেছিলেন। কেউ জোর করে কলম ধরায়নি, কেউ বাধ্যও করেনি। অথচ কয়েকদিন যেতে না যেতেই তারা উল্টো পথে হাঁটছে।

ডা. তাহের অভিযোগ করেন, বিএনপির এই আচরণ জাতীয় ঐক্যের পথে বড় বাধা। তিনি বলেন, দেশ যখন নতুন গণতান্ত্রিক ধারার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন এমন বিভ্রান্তিমূলক অবস্থান সংস্কার আন্দোলনের প্রতি আঘাত। এটি জাতিকে বিভক্ত করার এক নতুন কৌশল।

তিনি আরও বলেন, আমরা সংস্কারের মাধ্যমে এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে প্রশাসন ও রাজনীতি দুটোই জনগণের জবাবদিহির আওতায় থাকবে। কিন্তু বিএনপি সংস্কারের ধারাগুলোতে আপত্তি জানিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে— তারা সেই জবাবদিহি চায় না।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে উদ্দেশ করে জামায়াতের এ নেতা বলেন, শুনছি সরকার সব দলকে খুশি করতে চায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কোনো দলকে খুশি করা নয় জাতিকে খুশি করাই সরকারের দায়িত্ব। ন্যায় ও নীতির প্রশ্নে আপস নয়, এটা জাতির প্রত্যাশা।

তাহের দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, সংস্কার ছাড়া গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল থাকবে। আমরা স্পষ্ট বলছি সংস্কারের প্রশ্নে কোনো দল, ব্যক্তি বা বিদেশি চাপে আমরা নত হবো না।

জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলোর মধ্যে বিএনপির অবস্থানকে অপ্রত্যাশিত ও দ্বিমুখী আখ্যা দিয়ে তাহের বলেন, তারা জানে সংস্কার ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। তারপরও যদি তারা তা বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে দেশে নতুন রাজনৈতিক সংকটের জন্ম নেবে।

তিনি আরও যোগ করেন, আমরা চাই না দেশ আবার সংঘাতের রাজনীতিতে ফিরে যাক। তাই বিএনপি ও অন্যান্য দলকে অনুরোধ করছি— নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির স্বার্থে কাজ করুন।

সেমিনারে উপস্থিত নেতারা জানান, জামায়াতে ইসলামী জুলাই সনদে দেওয়া সংস্কার প্রস্তাবকে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা হিসেবে দেখছে। দলটির শীর্ষ পর্যায় জানায়, তারা এই সনদের প্রতিটি ধারাকে বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় ঐক্যবদ্ধ অবস্থান বজায় রাখবে।

একই অনুষ্ঠানে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, যারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে এখন তা অস্বীকার করছে, তারা আসলে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। জাতি এসব নাটক ভালোভাবেই বুঝে ফেলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এই বক্তব্যযুদ্ধ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত বহন করছে। 

একজন সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, জুলাই সনদ আসলে ছিল রাজনীতিতে ন্যূনতম সংস্কার ও জবাবদিহির ভিত্তি গড়ার চেষ্টা। বিএনপি যদি এখান থেকে পিছিয়ে যায়, তাহলে তারা গণতন্ত্রের দায় এড়াতে পারবে না।

অন্যদিকে, জামায়াতের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দলটি নিজেদের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেন পর্যবেক্ষকরা।

সেমিনারের শেষভাগে ডা. তাহের বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে আমরা ফ্যাসিবাদের বিপরীতে কতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি তার ওপর। গণতন্ত্র কোনো দলের সম্পত্তি নয় এটা জনগণের অধিকার। বিএনপি যদি সত্যিই জনগণের দল হতে চায়, তবে তাদের উচিত হবে ক্ষমতার রাজনীতি ছেড়ে সংস্কারের পথে ফিরে আসা।

ইএইচ