বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিএনপি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে পৌঁছানোর পর তারেক রহমান সরাসরি বিমানবন্দর থেকে জনসমাবেশের উদ্দেশে রওনা দেবেন। এরপর তিনি তার দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ মাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। কয়েক মাস ধরে অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে উদ্বেগ রয়েছে।
তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন বাংলাদেশ এক নাজুক রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এই সরকারের অধীনে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমন-পীড়ন ও বিতর্কিত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পর এই নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক হবে, সে দিকেই তাকিয়ে আছে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা।
রাজনৈতিক এই উত্তাল প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিঃসন্দেহে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর তার প্রত্যাবর্তন বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন।
তবে এই প্রত্যাবর্তনের পটভূমিতে উদ্বেগের জায়গাও কম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং গণমাধ্যমে হামলার ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে আক্রমণ এবং সাংবাদিকদের হুমকির ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্র কি আদৌ একটি নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ টেকসই হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।
এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার সরকার পতনের পেছনে যে তরুণ আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, সেই আন্দোলন থেকেই এনসিপির জন্ম। দলটির মুখপাত্র খান মুহাম্মদ মুরসালিন বলেন, তারেক রহমানকে চরম চাপ ও হুমকির মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। তাই তার দেশে ফেরা শুধুই ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রতীক।
তিনি আরও বলেন, তার আগমন বিএনপি নেতাকর্মীদের নতুন করে উদ্দীপ্ত করবে। গণতন্ত্রের পথে আমরা তার সঙ্গে থাকব। এনসিপির এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয়, ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও কিছু বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে উঠতে পারে—বিশেষ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও অবাধ নির্বাচনের প্রশ্নে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিকে নতুনভাবে সক্রিয় করবে। একই সঙ্গে এটি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এই প্রত্যাবর্তন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের সক্ষমতার বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণের প্রতিচ্ছবি। একদিকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আশা, অন্যদিকে সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার শঙ্কা—এই দুইয়ের মধ্যেই দেশ এগিয়ে চলেছে। আসন্ন নির্বাচন ও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশ সত্যিই একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক পথে ফিরতে পারবে কি না, তার অনেকটাই নির্ভর করবে এই সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর।
জেএইচআর