বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন ও প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে সংসদীয় রাজনীতির মূলধারায় সরাসরি সম্পৃক্ত হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-১৭ (গুলশান, বনানী, ঢাকা সেনানিবাস ও বারিধারা) থেকে তাঁর পক্ষে মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়েছে। কেবল ঢাকা নয়, তাঁর পৈত্রিক এলাকা বগুড়া-৬ (সদর) আসন থেকেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করেছে।
সোমবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে তারেক রহমানের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। তাঁর পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ফরহাদ হালিম ডোনার, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল সালাম এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া শেষে আব্দুল সালাম সাংবাদিকদের বলেন, এটি কেবল একটি মনোনয়নপত্র জমা নয়, বরং এটি স্বৈরাচার পরবর্তী বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের প্রতীক। যে নেতাকে দীর্ঘ ১৭ বছর দেশ থেকে দূরে রাখা হয়েছিল, আজ জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি নির্বাচনী লড়াইয়ে ফিরেছেন।
তারেক রহমানের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি। উল্লেখ্য যে, ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরির সময় তিনি কারাগারে ছিলেন এবং পরে চিকিৎসার জন্য ওই বছরই ১১ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকায় এবং পরবর্তী আওয়ামী লীগ শাসনামলে দেশে ফিরতে না পারায় তিনি ইতিপূর্বে ভোটার হতে পারেননি।
গত জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তিত হলে চলতি বছর ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে তিনি সপরিবারে দেশে ফেরেন। গত শনিবার ২৭ ডিসেম্বর তিনি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে গিয়ে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। গতকাল রোববার নির্বাচন কমিশন তাঁর আবেদন অনুমোদন দিলে তিনি ঢাকা-১৭ আসনের ভোটার হন। তাঁর মেয়ে জাইমা রহমানও একই সাথে ভোটার হয়েছেন।
গুলশান, বনানী ও বারিধারার মতো অভিজাত এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ আসনকে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু ধরা হয়। এই আসন থেকে তারেক রহমানের লড়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। দলীয় সূত্র জানায়, দেশি-বিদেশি কূটনীতিকদের আবাসন ও বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণে এই আসনটি থেকে তিনি বিশ্ববাসীকে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বার্তা দিতে চান।
তারেক রহমানের প্রার্থিতার প্রতি সম্মান জানিয়ে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এই আসন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তিনি এখন তাঁর পৈত্রিক আসন ভোলা-১ থেকে নির্বাচনে অংশ নেবেন।
ঢাকার পাশাপাশি তারেক রহমান তাঁর পৈত্রিক আসন বগুড়া-৬ (সদর) থেকেও নির্বাচন করছেন। বগুড়া বরাবরই বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এর আগে তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়াও এই আসন থেকে একাধিকবার বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন। গত ২১ ডিসেম্বর জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা তারেক রহমানের পক্ষে সেখান থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। বগুড়ার সাধারণ ভোটারদের মাঝে এখন আনন্দের জোয়ার বইছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন। ১১ ডিসেম্বর ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আজ ২৯ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন। যাচাই বাছাই শেষে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই অংশগ্রহণ বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিতে এক অভাবনীয় গতি যোগ করেছে। তরুণ ভোটারদের কাছে তাঁর ‘আমাদের একটি পরিকল্পনা আছে’ স্লোগানটি ইতোমধ্যেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
তারেক রহমানের নির্বাচনী মাঠে নামা বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতির চিত্র বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০০৮ সালে যে যুবক দেশ ছেড়েছিলেন, ২০২৫ সালে তিনি ফিরেছেন এক পরিণত রাষ্ট্রনায়কের প্রতিচ্ছবি নিয়ে। ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬, এই দুই আসনে তাঁর প্রার্থিতা বিএনপির রাজপথের আন্দোলনকে এখন ব্যালট পেপারের চূড়ান্ত লড়াইয়ে রূপান্তর করেছে। সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি এখন ১২ ফেব্রুয়ারির দিকে। রাজধানীর রাজপথ থেকে উত্তরবঙ্গের জনপদ, সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন একটাই, তারেক রহমানের সরাসরি রাজনৈতিক পদযাত্রা।
জেএইচআর