একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের মাধ্যমে ‘আপসহীন নেত্রী’তে পরিণত হয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল কণ্টকাকীর্ণ। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সময় তিনি ছিলেন নিতান্তই এক গৃহবধূ। তখন বিপর্যস্ত বিএনপির হাল ধরতে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি দলের প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগ দেন। মাত্র এক বছরের মাথায় তিনি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
দলের দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন আন্দোলন গড়ে তোলেন। কোনো ধরনের সমঝোতা না করায় তাঁর এই সংগ্রাম এরশাদের পতন ত্বরান্বিত করে এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনী ইতিহাসে তাঁর একটি অনন্য রেকর্ড রয়েছে—তিনি পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কটিতেই জয়ী হয়েছেন।
তবে ওয়ান-ইলেভেনের সময় থেকেই তাঁর ওপর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে। ২০০৭ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে দেশত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হলেও তিনি দেশ ছাড়েননি। এরপর বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলে তিনি চরম নির্যাতনের শিকার হন। ২০১৮ সালে কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, কারাগারে তাঁকে সুচিকিৎসা না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর তিনি মুক্তি পেলেও লিভার সিরোসিসসহ একাধিক জটিল রোগের কারণে তার অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন।
আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এই নেত্রী শেষ জীবন পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। গত ৬ আগস্ট সাজা মওকুফ এবং পরবর্তীতে চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালাস পেলেও তাঁর শারীরিক অবস্থার আর উন্নতি হয়নি। অবশেষে আজ ভোরে ৮০ বছর বয়সে এই মহীয়সী নেত্রী কোটি মানুষকে শোকসাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে এক অপূরণীয় শূন্যতা।
ইএইচ