বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময়ের প্রতিটি চড়াই-উতরাইয়ের সঙ্গী ছিলেন ফাতেমা বেগম।
মঙ্গলবার প্রিয় নেত্রীর প্রয়াণে চিরদিনের মতো সেই ছায়া হারালেন তিনি। এভারকেয়ার হাসপাতালে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন বেগম জিয়ার শিয়রে, যেমনটি ছিলেন বিগত ১৫ বছর ধরে।
রাজনীতির ইতিহাসে নেতা, আন্দোলন আর ক্ষমতার লড়াইয়ের কথা ঘটা করে লেখা হলেও ফাতেমার মতো নীরব সাক্ষীরা বরাবরই পর্দার আড়ালে থেকে যান। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার জীবনে ফাতেমা ছিলেন গৃহকর্মীর পরিচয়ের চেয়েও বড় কিছু একান্ত বিশ্বস্ত এক সঙ্গী। কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠ থেকে শুরু করে হাসপাতালের নিভৃত কক্ষ, এমনকি বিদেশ বিভুঁইয়েও ফাতেমা ছিলেন তার ছায়াসঙ্গী।
ভোলার সদর উপজেলার শাহ-মাদার গ্রামে জন্ম নেওয়া ফাতেমার জীবন ছিল শুরু থেকেই লড়াইয়ের। ২০০৮ সালে স্বামী হারুন লাহাড়ির মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখেছিলেন তিনি। ঠিক সেই কঠিন সময়ে, ২০০৯ সালে ভাগ্যের অন্বেষণে ঢাকায় এসে কাজ পান বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবনে। সেই থেকেই শুরু হয় এক ঐতিহাসিক সহযাত্রা।
২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’র উত্তাল দিনগুলোতে যখন বালুবোঝাই ট্রাক দিয়ে ফিরোজার দোরগোড়া রুদ্ধ ছিল, তখন অসুস্থ নেত্রীর হাত শক্ত করে ধরে ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা দিয়েছিলেন ফাতেমা। ২০১৮ সালে বেগম জিয়া যখন কারাবন্দী হলেন, তখন এই সাধারণ নারীটি স্বেচ্ছায় বন্দিত্ব মেনে নিয়ে কারাগারে তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন। ২০২১ সালের করোনা মহামারীর ভয়ংকর সময়েও যখন আপনজনেরাও কাছে আসতে দ্বিধা করছিলেন, ফাতেমা তখন অবিচল থেকে সেবা করেছেন তার প্রিয় ‘ম্যাডাম’কে।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একবার রাজনৈতিক কটাক্ষ করে বলেছিলেন, “কারাগারেও তাকে (খালেদা জিয়া) ফাতেমাকে লাগবে।”
রাজনীতির সেই বাক্যটিই ফাতেমার জন্য হয়ে উঠেছিল এক বিশাল আস্থার সনদ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি প্রমাণ করেছেন, কিছু সম্পর্ক ক্ষমতার নয়, বরং অকৃত্রিম মায়া আর মানবিকতার। আজ বেগম জিয়ার মৃত্যুর খবরে বাকরুদ্ধ ফাতেমা। প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে এখন তিনি এক গভীর শূন্যতায় আচ্ছন্ন। রাজনীতির কোলাহলে ফাতেমার নাম হয়তো সেভাবে উচ্চারিত হবে না, কিন্তু বেগম জিয়ার প্রতিটি দুঃসময়ের ইতিহাসে তার নীরব উপস্থিতি চিরকাল এক মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
ইএইচ