খালেদা জিয়ার মৃত্যু পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড: রুহুল কবির রিজভী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা প্রকাশিত: জানুয়ারি ২, ২০২৬, ০৯:৩৭ পিএম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক শোকাতুর অধ্যায় হয়ে থাকবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস। বিএনপির সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণকে কেবল একটি স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে গ্রহণ করতে পারছে না তার দল ও কোটি অনুসারী।

শুক্রবার রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে আয়োজিত এক বিশেষ প্রার্থনা সভায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত কড়া ও আবেগঘন মন্তব্য করেছেন।

তার মতে, বেগম জিয়ার এই অকাল চলে যাওয়ার পেছনে তৎকালীন সরকার ও শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ দায় রয়েছে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রয়াত নেত্রীর আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য বজায় রেখে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ ও বিএনপি নেতা, কর্মীরা একযোগে দেশনেত্রীর বিদেহী আত্মার কল্যাণ প্রার্থনা করেন। তবে আধ্যাত্মিক এই পরিবেশের মধ্যেই উঠে আসে রাজনৈতিক বিচার, বিশ্লেষণ ও গভীর অভিযোগের সুর। 

রুহুল কবির রিজভী তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ করেন যে, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তিনি একে একটি ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। 

রিজভী বলেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে কারান্তরীণ থাকা অবস্থায় বেগম জিয়াকে প্রয়োজনীয় উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বারবার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার আবেদন করা সত্ত্বেও তা নাকচ করে দেওয়া ছিল তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি নীল নকশা। রিজভীর ভাষায়, "নির্যাতন ও অবহেলার মাধ্যমেই আমাদের প্রিয় নেত্রীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।"

বক্তব্যে রিজভী সরাসরি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই ঘটনার জন্য দায়ী করেন। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই বেগম জিয়াকে উন্নত চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়নি। 

রিজভী অভিযোগ করেন যে, সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ এবং নেতিবাচক মনোভাবের কারণেই একটি মহাকাব্যের অবসান ঘটেছে। 

তিনি মনে করেন, ইতিহাস কোনোদিন এই অবিচার ক্ষমা করবে না এবং একদিন এই ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের’ বিচার বাংলার মাটিতেই হবে। 

শোকাতুর নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে রিজভী আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে শারীরিকভাবে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও কোটি মানুষের হৃদয়ে তার যে স্থান রয়েছে, তা কেউ কোনোদিন মুছে ফেলতে পারবে না। তিনি গণতন্ত্রের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা এদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। 

পূজা উদযাপন ফ্রন্টের নেতাকর্মীরাও এই সময় বেগম জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং দেশের ক্রান্তিলগ্নে তার অভাববোধের কথা তুলে ধরেন।

এই বিশেষ প্রার্থনা ও শোকসভায় পূজা উদযাপন ফ্রন্টের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। দলমত নির্বিশেষে অনেককেই দেখা গেছে কান্নায় ভেঙে পড়তে। 

অনুষ্ঠানে উপস্থিত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা বলেন, বেগম খালেদা জিয়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একজন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন। তার শাসনামলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় নেওয়া পদক্ষেপগুলো তারা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। 

এই আয়োজনে সম্প্রীতির বার্তা দেওয়া নেতৃবৃন্দ হলেন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় ও মহানগর কমিটির সদস্যবৃন্দ।

রুহুল কবির রিজভীর এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। বিএনপির তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এখন এই প্রয়াণের পেছনের কারণগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবছে। 

বেগম খালেদা জিয়ার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার দায়ভার ইতিহাসের কাঠগড়ায় শেখ হাসিনা সরকারকেই দিতে হবে, এমনটাই মনে করেন বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বেগম খালেদা জিয়ার মতো একজন জনপ্রিয় নেত্রীর শেষ মুহূর্তের চিকিৎসা ও সুযোগ, সুবিধা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক করুণ প্রতিচ্ছবি। তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় পুরো দেশ আজ শোকাতুর।

ইএইচ