ভোটের লড়াই শুরুর আগেই ঘরের কোন্দল মেটাতে ব্যস্ত সময় পার করছে বিএনপি। এক দিকে দলীয় প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করা, অন্য দিকে মিত্র দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতার মর্যাদা রক্ষা— এই দুই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের বাগে আনতে মরিয়া দলটি। ১১৭টি আসনে বিএনপির ১১৯ জন নেতার স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার তথ্য উঠে আসায় নড়েচড়ে বসেছে নয়াপল্টন ও গুলশান কার্যালয়।
প্রথম ধাপ: সমঝোতা ও বোঝানোর চেষ্টা
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, হুট করে বহিষ্কার না করে প্রথমে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ভুল বুঝতে সময় দেওয়া হচ্ছে। এজন্য অঞ্চলভিত্তিক জ্যেষ্ঠ নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। দলীয় ঐক্য কেন প্রয়োজন এবং এখন বিদ্রোহ করলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কী প্রভাব পড়তে পারে— তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে বুঝিয়ে বলা হচ্ছে।
দলীয় নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের ত্যাগী অনেক নেতা মনোনয়ন না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাদের মানভঞ্জন করা গেলে দলের ভোট ব্যাংক অক্ষুণ্ণ থাকবে। ইতিমধ্যে এই প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু নেতা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে রাজি হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে পরিস্থিতি জটিল হলে খোদ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এই প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পারেন।
দ্বিতীয় ধাপ: কঠোর বার্তা ও বহিষ্কার
বোঝানোর নীতিতে কাজ না হলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, আমরা প্রতিনিয়ত তাদের বোঝাচ্ছি। এরপরও যদি বোধোদয় না হয়, তবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
ইতিমধ্যে বিভিন্ন অভিযোগে ৯ জন নেতাকে বহিষ্কারের মাধ্যমে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। আগামী ২০ জানুয়ারির পর যারা নির্বাচনী মাঠে টিকে থাকবেন, তাদের দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কেবল দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষেই সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। কোনো ইউনিটের নেতাকর্মীরা যদি বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন, তবে সংশ্লিষ্ট কমিটিও ভেঙে দেওয়া হতে পারে।
শরিকদের অস্বস্তি ও মাঠের বাস্তবতা
বিএনপি ১৬টি আসনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের ছাড় দিলেও মাঠের চিত্র এখনো ধূসর। মিত্র দলগুলোর প্রার্থীরা অভিযোগ করছেন, আসন ছেড়ে দিলেও স্থানীয় বিএনপি তাদের পূর্ণ সহযোগিতা দিচ্ছে না।
উদাহরণস্বরূপ, পটুয়াখালী-৩ আসনে নুরুল হক নুর কিংবা ভোলা-১ আসনে আন্দালিভ রহমান পার্থর মতো হেভিওয়েট প্রার্থীরাও স্থানীয় বিএনপির সক্রিয় সহযোগিতা পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক জায়গায় স্থানীয় বিএনপির নেতারা জোটের প্রার্থীর বদলে তাদের নিজস্ব ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর প্রতি অনুগত থাকছেন। মাহমুদুর রহমান মান্না (বগুড়া-২) কিংবা জোনায়েদ সাকির (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬) মতো নেতাদের অভিযোগ, কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে স্পষ্ট বার্তা না পৌঁছানোয় মাঠপর্যায়ে দ্বিধা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
সমঝোতার আসন ও ধানের শীষের লড়াই
এবারের নির্বাচনে বিএনপি শরিকদের জন্য যেসব আসন ছেড়েছে, তার মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রার্থী বিএনপির প্রতীকে (ধানের শীষ) লড়াই করছেন। ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, রাশেদ খাঁন, শাহাদাত হোসেন সেলিমদের মতো নেতারা সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচন করছেন। অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মতো দলগুলো তাদের নিজস্ব প্রতীকে লড়ছে। জোট প্রার্থীরা এখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি হস্তক্ষেপ চাইছেন যাতে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তাদের পক্ষে জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করে।
বিদ্রোহের কারণ ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির দীর্ঘদিনের পুরোনো নেতাদের বাদ পড়া এবং স্থানীয় নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই বিদ্রোহী প্রার্থী বাড়ার মূল কারণ। বিএনপির অগ্রাধিকার এখন ভোট ভাগাভাগি রোধ করা। যদি বিদ্রোহী প্রার্থীদের শেষ পর্যন্ত বসিয়ে দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে অনেক আসনেই আওয়ামী লীগ বা অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সুবিধা পাওয়ার পথ প্রশস্ত হতে পারে।
এএন