বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমীকরণ নতুন মোড় নিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আজ ঘোষণা করেছেন যে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তাদের জোট নির্বাচনী লড়াইয়ের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই জোটের চূড়ান্ত আসন বণ্টন এবং প্রার্থীর তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব তথ্য জানান। ইইউ-এর চিফ ইলেকশন অবজারভার আইভার্স ইজাবসের নেতৃত্বে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, দেশের অন্যান্য প্রধান জোটগুলো যখন আসন ভাগাভাগি এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যকার বোঝাপড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে। তিনি বলেন, আমরা সাংগঠনিকভাবে এখন অনেক বেশি গোছানো। অভ্যন্তরীণ সকল প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। নির্বাচনী মাঠে আমাদের জোট ইতিমধ্যে প্রচারণা শুরু করে দিয়েছে। এখন কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত ও এনসিপির এই কৌশলগত ঐক্য নির্বাচনের মাঠে বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ পরিবেশ বা 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এনসিপি আহ্বায়ক। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সময়েও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে
নাহিদ ইসলামের ভাষায়, একটি বিশেষ দলকে সরকারি প্রটোকল দেওয়ার অর্থ হলো প্রশাসনকে একটি পরোক্ষ সংকেত দেওয়া। যখন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা দেখেন যে সরকার একটি বিশেষ দলের প্রতি নমনীয়, তখন তারা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেন না। এটি নির্বাচনী মাঠে একটি অসম পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে।
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম মূলধারার সংবাদমাধ্যমের একাংশের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন যে, কয়েকটি বিশেষ মিডিয়া হাউজ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এনসিপি এবং তাদের জোটের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ও মিথ্যা সংবাদ (Fake News) প্রচার করছে।
তিনি বলেন, আমরা লক্ষ্য করছি, কিছু মিডিয়া একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য আমাদের টার্গেট করছে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কেবল প্রশাসন নয়, মিডিয়াকেও নিরপেক্ষ থাকতে হবে। আমরা নির্বাচন কমিশন এবং সরকারকে বারবার অনুরোধ করেছি যাতে সব দল সমান মিডিয়া কভারেজ পায়।
নির্বাচনী যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ঋণখেলাপিদের বৈধতা দেওয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকার সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, অনেকেই বিশাল অঙ্কের ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইসি নামমাত্র কয়েকজনকে বাদ দিয়ে বড় বড় রাঘববোয়ালদের ছাড় দিচ্ছে। আমরা চাই ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হোক।
নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই নাশকতার ছায়া জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা করার পরও খুনিরা যখন গ্রেপ্তার হয় না, তখন সাধারণ প্রার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি নির্বাচনী পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে।
ইইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের নির্যাস তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায়। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবার বড় আকারের পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে। তারা চায় নির্বাচনের পর যেন শান্তিপূর্ণভাবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটে। এ জন্য তারা সকল রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করছে।
নাহিদ ইসলামের আজকের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, আগামী জাতীয় নির্বাচনে এনসিপি-জামায়াত জোট একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছে। একদিকে তারা আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে প্রশাসন ও মিডিয়ার বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার। আগামী কয়েক দিনের আসন ঘোষণাই বলে দেবে নির্বাচনী ময়দানে এই জোটের প্রকৃত শক্তি কতটুকু।
জেএইচআর