বাংলাদেশের অর্থনীতির রুদ্ধদ্বার দশা কাটাতে এবং কর্মসংস্থানে গতি ফেরাতে একগুচ্ছ বৈপ্লবিক সংস্কারের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বিএনপি। দলটির উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের মতে, ১৯৯১ সালে বিএনপিই দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির সূচনা করেছিল। এবার তারা সেই ধারাকে আরও আধুনিকায়ন করে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’র পথে হাঁটতে চায়।
বিএনপির আসন্ন ইশতেহারে সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। দলটি মনে করে, শুধু বড় শিল্পকারখানা দিয়ে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয়। তাই ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, আইটি সেক্টর এবং সৃজনশীল পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে।
তথাকথিত বড় ঋণের পেছনে না ছুটে পুঁজির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা হবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (SME) উদ্যোক্তাদের জন্য।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, অর্থনীতির প্রতিটি অংশকে জিডিপিতে অবদান রাখার সুযোগ করে দিতে হবে। আমরা একে বলছি ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’। আমাদের এবারের ইশতেহারে এই সৃজনশীল অর্থনীতির বিস্তারিত রোডম্যাপ থাকবে, যেখানে মেধা ও প্রযুক্তির সঠিক মূল্যায়ন হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের পাহাড় এবং অব্যবস্থাপনা দূর করতে বিএনপি চাচ্ছে আমূল পরিবর্তন। দলটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষমতায় গেলে সরকারের ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ’ তুলে দেওয়া হবে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর ওপর অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক—উভয়ের নিয়ন্ত্রণ থাকায় এক ধরণের ‘দ্বৈত শাসন’ চলে, যা স্বচ্ছতা নষ্ট করে। বিএনপি চায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকই হবে অর্থনীতির একমাত্র প্রধান নিয়ন্ত্রক বা ‘ওয়াচডগ’। ব্যাংকিং সেক্টরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে একে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে।
ব্যাংকগুলোর ওপর বড় ঋণের চাপ কমাতে বিকল্প হিসেবে শক্তিশালী পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট চালুর পরিকল্পনা করছে বিএনপি। বড় বড় মেগা প্রকল্পের জন্য ব্যাংক থেকে টাকা না নিয়ে বন্ডের মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে। এতে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট কমবে এবং সাধারণ মানুষও লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ পাবে।
নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের দাপট এবং চাঁদাবাজি বন্ধ করা বিএনপির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। দলটি মনে করে, প্রচলিত পদ্ধতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাই সাপ্লাই চেইন বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ‘ডিজিটাল নজরদারি’ চালু করা হবে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগী বা অপ্রয়োজনীয় দালালদের দৌরাত্ম্য কমবে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে সরাসরি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে দলটি।
১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আমদানি-রপ্তানি নীতি সহজীকরণ এবং বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করার মাধ্যমে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের উপরে নিয়ে গিয়েছিল। গত কয়েক দশকে অর্থ পাচার এবং খেলাপি ঋণের কারণে অর্থনীতি যে চোরাবালিতে আটকে গেছে, সেখান থেকে বের হতে বিএনপি আবার ‘বাজারমুখী’ দর্শনে ফিরতে চায়। তবে এবারের বাজারমুখী হওয়াটা হবে অনেক বেশি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর।
বিএনপির এই উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলো ভোটারদের মাঝে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়। দলটির দাবি, তাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ কেবল মধ্যম আয়ের দেশ নয়, বরং একটি প্রকৃত আধুনিক অর্থনীতির রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
এএন