জোটের সমীকরণ ও তৃণমূলের বিদ্রোহে চাপে ধানের শীষ

রুহেল হাশেমী প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৩, ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
ফাইল ছবি

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এক অভূতপূর্ব অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পড়েছে বিএনপি। প্রায় অর্ধশতাধিক আসনে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিদ্রোহী অবস্থান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে টিকে থাকার অনড় ঘোষণা দলটির হাইকমান্ডকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে। বহিষ্কারের খড়্গ কিংবা আলোচনার টেবিলে সমঝোতার প্রস্তাব, কোনো কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না এই বিদ্রোহীদের। 

ফলে অনেক আসনেই ধানের শীষের প্রার্থীর বিজয় এখন ঘরের শত্রুর কারণেই হুমকির মুখে পড়েছে।

বিএনপির এই বিদ্রোহী সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো জোটসঙ্গীদের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া। বিশেষ করে ঢাকা-১২ আসনে জোটের সমীকরণ মেলাতে গিয়ে খোদ ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবকে মনোনয়ন বঞ্চিত হতে হয়েছে। ওই আসনটি বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হকের জন্য ছেড়ে দেয় বিএনপি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে নেমেছেন জনপ্রিয় এই নেতা।

তার সোজাসাপ্টা বক্তব্য হলো, নির্বাচনটি নেতাদের নয়, বরং জনগণের। 

সাইফুল আলম নীরব বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিন্তু ১৫-২০ জন নেতার নির্বাচন নয়, এটি জনগণের নির্বাচন। তিনি জনগণের চাপের মুখে দাঁড়িয়েছেন এবং যা করবেন তা জনগণের কথা মতোই করবেন। এখানে আপস করার সুযোগ নেই।

জোটের স্বার্থে আসন ছেড়ে দেওয়ার পর অনেক স্থানেই স্থানীয় বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা জোটসঙ্গীদের প্রার্থীর ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। পটুয়াখালী-৩ আসনেও একই চিত্র ফুটে উঠেছে। সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন হাসান মামুন। তিনি গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে নারাজ। 

হাসান মামুনের দাবি অনুযায়ী, অতীতে যখন বিএনপি কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে বা নেতাকর্মীদের রক্তাক্ত করা হয়েছে, তখন এই জোটসঙ্গীদের দেখা মেলেনি।

তিনি বলেন, থানা বিএনপি বললেই সাধারণ ভোটাররা গণ অধিকারকে ভোট দেবে, এই চিন্তা অবান্তর। ৫ লাখ জনগণের সাথে মোনাফেকি করে তিনি ভবিষ্যতে রাজনীতি করতে চান না।

শুধু জোটের আসন নয়, বিএনপির দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহী হয়ে দাঁড়িয়েছেন অনেক প্রভাবশালী নেতা। নাটোর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন দাউদার মাহমুদ। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও তিনি অদ্ভুত এক যুক্তি দিচ্ছেন। 

দাউদার মাহমুদের মতে, তিনি মাঠে না থাকলে ধানের শীষের প্রার্থী হেরে যেতেন, তাই তিনি দলের স্বার্থেই স্বতন্ত্র লড়ছেন। এই ধরনের দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। অনেক স্থানে বিদ্রোহী ও দলীয় প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং ধানের শীষের ভোট ব্যাংক ভাগ হওয়ার প্রবল শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিদ্রোহীদের লাগাম টানতে বিএনপি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ দিবসেই নয়জন প্রভাবশালী বিদ্রোহী নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে বহিষ্কারের এই সিদ্ধান্তও বিদ্রোহীদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। দল সমঝোতার জন্য তাদের ঢাকায় ডেকেছে, কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের প্রার্থী আবদুল খালেক ছাড়া আর কেউই সেই আলোচনায় ইতিবাচক সাড়া দেননি। 

পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্রোহীদের সাথে সরাসরি কথা বলছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ কমিটি গঠন করে বিদ্রোহীদের শান্ত করার চেষ্টা চলছে। বিএনপি নেতারা আশ্বাস দিচ্ছেন যে, যারা দলের স্বার্থে মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন, ভবিষ্যতে তাদের বড় পদ বা মূল্যায়ন করা হবে।

এত সব সংকটের মাঝেও বিএনপির শীর্ষ নেতারা বিশ্বাস করেন যে, ভোটের চূড়ান্ত সময়ের আগেই বরফ গলবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিষয়টিকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। 

তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে শেষ বলে কোনো শব্দ নেই। দলীয় শৃঙ্খলার স্বার্থে ব্যবস্থা নিতেই হয়, তবে মনোনয়নের প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর দেখা যাবে সবাই ধানের শীষের প্রার্থীর সাথেই কাজ করছে।’ 

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ১৫ বছরে রাজপথে লড়াই করা অনেক নেতা এবার সংসদ সদস্য হওয়ার শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের আশঙ্কা হলো, এবার সুযোগ হাতছাড়া হলে দলে তাদের গুরুত্ব কমে যেতে পারে। ফলে তারা করো অথবা মরো নীতিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। যদি এই বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকেন, তবে বিএনপি জোটের জন্য বেশ কিছু নিশ্চিত আসন হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আগামী এক সপ্তাহ বিএনপির জন্য অগ্নিপরীক্ষার মতো। বিদ্রোহীদের বশে এনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে না পারলে নির্বাচনের ময়দানে ধানের শীষের পথ মসৃণ হবে না।

ইএইচ