১১ দলীয় জোটে আসন ভাগাভাগি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০১:১০ পিএম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গঠিত ১১ দলীয় জোটে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের অন্যতম প্রধান শরিক ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আসন সমঝোতা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অস্থিরতা। আসন বণ্টন নিয়ে সৃষ্ট অসন্তোষের জেরে আজ বুধবার বিকেলের নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনের আগেই জোটের ঐক্য সুতায় ঝুলছে।

নির্বাচনী মাঠে নিজেদের শক্তির জানান দিতে জোটবদ্ধ হলেও এখন আসন সংখ্যা নিয়েই শুরু হয়েছে মূল দ্বন্দ্ব। জামায়াতে ইসলামী যেখানে বড় ভাই সুলভ আচরণ করে আসন বণ্টনের নেতৃত্ব দিচ্ছে, সেখানে শরিক দলগুলো তাদের প্রাপ্য সম্মান ও আসন পাচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলেছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অবস্থান: চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন এই দলটি শুরু থেকেই শতাধিক আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। আলোচনার টেবিলে তারা নমনীয় হয়ে শেষ পর্যন্ত ৫০টির বেশি আসনের দাবি জানায়। কিন্তু জামায়াত তাদের মাত্র ৪০টি আসন ছাড় দিতে চায়। এই ১০-১৫টি আসনের ব্যবধানই এখন জোটের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দাবি: আল্লামা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৫ থেকে ৩০টি আসন দাবি করলেও জামায়াত ২০টির বেশি আসন ছাড়তে নারাজ। এই পরিস্থিতিতে মামুনুল হক জানিয়েছেন, সমঝোতা না হলে তারা নির্দিষ্ট আসনগুলোতে প্রার্থী উন্মুক্ত করে দেবেন।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পুরানা পল্টন ও রামপুরার একটি মাদ্রাসায় ইসলামী আন্দোলনের নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলা এই বৈঠকে তৃণমূলের নেতারা জামায়াতের ‘একক সিদ্ধান্ত’ গ্রহণের প্রবণতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূলের নেতারা মনে করছেন জামায়াত শরিকদের অবমূল্যায়ন করছে। বিশেষ করে জামায়াত যখন ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আলোচনা চলাকালীন সময়েই পৃথকভাবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) বা এবি পার্টির সঙ্গে বৈঠক করে, তখন অন্য শরিকদের তা জানানো হয়নি। এই 'গোপনীয়তা' বা 'দ্বিচারিতা' জোটের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

জোটের শরিক দলগুলোর নেতাদের মতে, জামায়াতে ইসলামী কিছু সিদ্ধান্ত এককভাবে নিচ্ছে। ১১ দলের আলোচনার সমান্তরালে জামায়াত আমীর শফিকুর রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে 'জাতীয় সরকার' গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের একাংশ একে রাজনৈতিক দ্বিচারিতা হিসেবে দেখছে। তাদের প্রশ্ন—একদিকে নির্বাচনী জোটের আলাপ, অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে সমান্তরাল যোগাযোগ কেন?

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ইসলামী আন্দোলন প্রথম ‘ওয়ান বক্স’ পলিসি বা একটি আসনে একজন অভিন্ন প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে কাজ শুরু করে। শুরুতে ৫টি দল (ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি) এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ষষ্ঠ দল হিসেবে জামায়াত যোগ দেয় এবং ধীরে ধীরে জোটের আকার ১১ দলে গড়ায়। কিন্তু এখন এই বর্ধিত জোটই যেন তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের ভেতরের খবর অনুযায়ী, দলের শুরা কাউন্সিল বা মজলিশে আমেলা যাই বলুক না কেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের (চরমোনাই পীর) ওপর। তিনি যদি জোটের বৃহত্তর স্বার্থে সমঝোতা মেনে নেন, তবেই এই জোট টিকবে। অন্যথায় ইসলামী আন্দোলন এককভাবে বা ছোট পরিসরে নির্বাচনে যেতে পারে।

এ বিষয়ে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন জানান, আজ বুধবার জোহরের পর মজলিশে আমেলার বৈঠক শেষে চূড়ান্ত অবস্থান পরিষ্কার করা হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ আজ সকালে এক বার্তায় জানিয়েছেন, তারা জোট ভাঙতে চান না ঠিকই, তবে বড় শরিক ইসলামী আন্দোলন যদি জোট ত্যাগ করে, তবে তাদেরও জোটে থাকা না থাকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। অর্থাৎ, ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে গেলে পুরো জোটটিই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এতসব অস্থিরতার মধ্যেও জামায়াতে ইসলামী এখনো ইতিবাচক। তারা আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে একটি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে। সেখানে ১১ দলের আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করার ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, শেষ মুহূর্তে দলগুলো একটি সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবে।

এই জোটের অন্তর্ভুক্ত দলগুলো হলো:

১. বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
২. ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
৩. বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
৪. খেলাফত মজলিস
৫. বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন
৬. বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি
৭. জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)
৮. বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)
৯. জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)
১০. লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)
১১. আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ১১ দলীয় জোট কি শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারবে? নাকি আসন ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে আদর্শিক লড়াই ভেস্তে যাবে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত যদি ছাড় না দেয়, তবে এই জোটের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আজ বিকেলের সংবাদ সম্মেলনই বলে দেবে বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির নতুন মেরুকরণ কোন দিকে যাচ্ছে।

এএন