আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ ও ‘হঠকারী’ আখ্যা দিয়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সামনে বিশাল অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
রোববার বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে ছাত্রদলের হাজার হাজার নেতা-কর্মী অংশ নেন। তিনটি সুনির্দিষ্ট ইস্যু বা দাবির ভিত্তিতে আয়োজিত এই অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে দিনভর উত্তপ্ত ছিল আগারগাঁও এলাকা।
রোববার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেতা-কর্মীদের ভিড় বাড়তে থাকে, যা একপর্যায়ে প্রধান সড়কের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। বিশৃঙ্খলা এড়াতে ইসির প্রধান ফটকের সামনে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ব্যারিকেড দিয়ে অবস্থান নেন।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির-এর নেতৃত্বে এই অবস্থান কর্মসূচিতে সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় নেতা-কর্মীরা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং ইসিকে বিশেষ কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর তল্পিবাহক না হওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
কর্মসূচি চলাকালে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির সাংবাদিকদের সামনে আন্দোলনের মূল তিনটি কারণ বা ইস্যু ব্যাখ্যা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবর্তে অদৃশ্য কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে। ছাত্রদলের উত্থাপিত তিনটি প্রধান ইস্যু হলো:
১. পোস্টাল ব্যালট নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক: নাছির উদ্দিন নাছির অভিযোগ করেন, আসন্ন নির্বাচনের পোস্টাল ব্যালট নিয়ে নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি একটি বাসায় অনেক পোস্টাল ব্যালট পাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "পোস্টাল ব্যালট নিয়ে যে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন ছিল, তা কমিশন নিশ্চিত করতে পারেনি। এতে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে, ইসি কি কোনো বিশেষ পক্ষকে জেতানোর জন্য আগাম কারচুপির ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে? ছাত্রদলের প্রথম দাবি হলো—পোস্টাল ব্যালট নিয়ে সৃষ্ট এই বিতর্কের অনতিবিলম্বে সমাধান করতে হবে।
২. হঠকারী ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত: ছাত্রদলের দ্বিতীয় ইস্যুটি হলো ইসির পেশাদারত্ব নিয়ে। নাছির উদ্দিন বলেন, বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপে পড়ে ইসি তার দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে সরে এসে হঠকারী ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা গেলেও বর্তমান কমিশনের কাজকর্মে তার প্রতিফলন নেই। বিশেষ গোষ্ঠীর রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কমিশন নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
৩. শাবিপ্রবি ছাত্র সংসদ নির্বাচন থেকে পিছু হটা: তৃতীয় এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি হলো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন। ছাত্রদলের দাবি, শাকসু নির্বাচনের অনুমতি দিয়ে কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করলেও পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট মহলের চাপে সেই সিদ্ধান্ত থেকে তারা সরে এসেছে। ছাত্রদলের মতে, এটি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন নয়, বরং দেশের ছাত্র রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ওপর একটি আঘাত। রাজনৈতিক চাপের মুখে ইসির এ ধরনের নজিরবিহীন নতি স্বীকারকে তারা ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ কাজ বলে গণ্য করছে।
অবস্থান কর্মসূচিতে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। কিন্তু নির্বাচন কমিশন যদি শুরুতেই পক্ষপাতিত্ব শুরু করে, তবে ছাত্রসমাজ তা মেনে নেবে না। জুলাই-আগস্টের বিপ্লবের রক্ত এখনো শুকায়নি। আমরা কোনোভাবেই আবারও কোনো সাজানো নির্বাচন হতে দেব না।
সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, নির্বাচন কমিশন এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল মিলে আসন্ন নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি আজকের মধ্যে পোস্টাল ব্যালট ও ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইসি তাদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে, তবে ছাত্রদল সারা দেশের ছাত্রসমাজকে সাথে নিয়ে আরও কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।
ছাত্রদলের অবস্থান কর্মসূচির কারণে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবন ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ব্যারিকেডের কারণে ইসি কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রবেশ ও বের হওয়া সীমিত হয়ে পড়ে। তবে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের এই আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বা রাত পর্যন্ত তারা এই অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।
বিকেল পর্যন্ত পাওয়া খবরে দেখা গেছে, নেতা-কর্মীরা সড়কের ওপর বসে বক্তৃতা ও প্রতিবাদী গান গেয়ে অবস্থান করছেন। এতে ওই এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে বিকল্প পথ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ছিল, ছাত্রদলের এই অবস্থান কর্মসূচি তাকে আরও উসকে দিল। বিশেষ করে পোস্টাল ব্যালট এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে ইসির পিছু হটা বা বিতর্কিত ভূমিকা আগামী জাতীয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, ছাত্রদলের এই আলটিমেটাম ও অবস্থানের মুখে নির্বাচন কমিশন কোনো নতুন পদক্ষেপ নেয় কি না।
এএন