আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে মেরুকরণ স্পষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার পর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্যতম প্রধান শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের মনোনীত ২৭ জন প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করেছে। জোটে সমঝোতার মাধ্যমে প্রাপ্ত ৩০টি আসনের মধ্যে বাকি তিনটি আসনেও দ্রুতই প্রার্থী ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে দলটি।
রোববার বিকেলে এনসিপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রার্থীদের নাম ও ছবিসহ পোস্টার প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণার আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়। দলটির প্রার্থীরা ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার লড়াইয়ে নামছেন।
এনসিপি ঘোষিত তালিকায় দেশের সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতার নাম উঠে এসেছে। বিশেষ করে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ঢাকা-১১ আসনে নির্বাচন করছেন এনসিপির আহ্বায়ক এবং জনপ্রিয় মুখ নাহিদ ইসলাম। ঢাকা-৮ আসনে লড়বেন দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ঢাকা-১৮ আসনে লড়াই করবেন আরিফুল ইসলাম আদীব। ঢাকা-৯, ঢাকা-১৯ ও ঢাকা-২০ আসনে যথাক্রমে জাবেদ রাসিন, দিলশানা পারুল এবং নাবিলা তাসনিদকে প্রার্থী করা হয়েছে। ঢাকার বাইরেও তারুণ্যের জয়জয়কার লক্ষ্য করা গেছে। ছাত্র আন্দোলনের সময় উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের আন্দোলনকে সুসংগঠিত করা নেতারা নিজ নিজ জেলা থেকে লড়াইয়ে নামছেন।
পঞ্চগড়-১ আসনে উত্তরাঞ্চলের আলোচিত নেতা ও মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম লড়বেন। কুমিল্লা-৪ আসনে দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ এবং রংপুর-৪ আসনে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন লড়বেন।
নোয়াখালী-৬ আসনে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ প্রার্থী হয়েছেন। নির্বাচনী সমঝোতায় প্রাপ্ত ২৭টি আসনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তরুণ ও শিক্ষিত পেশাজীবীরা।
অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনে মাহবুব আলম, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আবদুল্লাহ আল আমিন এবং চট্টগ্রাম-৮ আসনে জোবাইরুল হাসান আরিফ।
এছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মাওলানা আশরাফ মাহদী, নাটোর-৩ আসনে এস এম জার্জিস কাদির এবং পিরোজপুর-৩ আসনে লড়বেন শামীম হামিদী।
গত বৃহস্পতিবার রাতে কাকরাইলে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জামায়াত ও এনসিপিসহ ১০টি দল ২৫৩টি আসনে নির্বাচনী সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছিল। শুরুতে এ জোটে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের থাকার জোরালো সম্ভাবনা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তারা এককভাবে ২৬৮ আসনে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন জানান, যদিও তারা ৩০টি আসন পেয়েছেন, কিন্তু তাদের ৪৭ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় এনসিপি এখন তাদের আসন সংখ্যা বাড়ানোর জন্য জামায়াতের সাথে দরকষাকষি করছে।
তবে জামায়াত সূত্র বলছে, তারা এখনো ইসলামী আন্দোলনের জন্য আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে। যদি শেষ পর্যন্ত তারা জোটে না ফেরে, তবে এনসিপির আসন সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এনসিপির এ প্রার্থী ঘোষণা কেবল একটি তালিকা নয়, বরং এটি দেশের প্রথাগত রাজনীতির বাইরে নতুন ধারার একটি চ্যালেঞ্জ। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর এ প্রথম আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিরা সরাসরি সংসদীয় রাজনীতিতে নামছেন। নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম বা হাসনাত আবদুল্লাহর মতো তরুণ নেতাদের নির্বাচনী লড়াই প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় পরীক্ষা হবে।
শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে তরুণ ভোটারদের মন জয় করা এনসিপির জন্য বড় লক্ষ্য। জামায়াতের মতো সুসংগঠিত শক্তির সাথে এনসিপির তারুণ্যের মিশেল নির্বাচনী মাঠে কেমন প্রভাব ফেলে, তাই এখন দেখার বিষয়।
দেশের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে। এনসিপি যে ২৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে, সেখানে জয়ী হওয়া কেবল রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং গত আগস্টের গণবিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার একটি সংগ্রাম হিসেবে দেখছেন দলটির কর্মীরা। বাকি তিনটি আসনে কারা আসছেন এবং জামায়াতের সাথে আসন বৃদ্ধির আলোচনা কোথায় গিয়ে থামে তা জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
ইএইচ/এএন