জামায়াতের ২১ দফা রূপরেখা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা উন্মোচন

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২০, ২০২৬, ১১:২২ এএম

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত ‘পলিসি সামিট-২০২৬’ শীর্ষক সম্মেলনে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ‘নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’-এর একটি বিস্তারিত নীতিগত রূপরেখা পেশ করেন। এই সম্মেলনে গণতান্ত্রিক রূপান্তর, টেকসই অর্থনীতি এবং মানবিক মর্যাদাকে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

শাসনব্যবস্থার নতুন দিশা: ১৮ কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশ এখন এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেন ডা. শফিকুর রহমান। সম্মেলনে তিনি বলেন, “আগামী নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক রুটিন আয়োজন নয়। ১৮ কোটির বেশি মানুষের এই দেশে শাসনব্যবস্থার নতুন দিশা নির্ধারণের এটিই শ্রেষ্ঠ সময়। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং ‘স্থিতিশীলতা’ অর্জনের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেন।

তারুণ্য ও কর্মসংস্থান: রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার

দেশের শিক্ষিত বেকারদের দুর্দশার কথা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, 'বর্তমানে আমাদের তরুণ সমাজ উচ্চশিক্ষা নিয়েও সম্মানজনক কাজ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। এই বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।' তিনি ঘোষণা করেন যে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কর্মসংস্থানকে কেবল বিনিয়োগের ফল হিসেবে দেখবে না, বরং একে একটি ‘রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার’ হিসেবে বিবেচনা করবে। বিশেষ করে দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার ওপর জোর দেন তিনি।

নারীর অংশগ্রহণ: ন্যায়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রয়োজন

বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য নারীর ভূমিকা নিয়ে জামায়াত তাদের অবস্থান আরও পরিষ্কার করেছে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনসংখ্যার অর্ধেককে পেছনে ফেলে কোনো দেশ সমৃদ্ধ হতে পারে না। নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো কেবল ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক আবশ্যকতা। তিনি নারীদের সামনে থাকা বিদ্যমান কাঠামোগত বাধাগুলো দূর করার আহ্বান জানান যাতে তারা দেশের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় অর্থবহ ভূমিকা রাখতে পারেন।

প্রবাসীদের মর্যাদা ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্তকরণ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে জামায়াত আমির বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তবে তাদের অবদান শুধু অর্থেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে দেশ গঠনে কাজে লাগাতে চায় জামায়াত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দেওয়া এসব পেশাজীবীদের জন্য দেশে কাজ করার সুযোগ ও পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এই রূপরেখায়।

অর্থনৈতিক সাফল্যের নতুন মানদণ্ড

প্রবৃদ্ধির গতানুগতিক সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জিডিপির সংখ্যা দিয়ে মানুষের সুখ মাপা যায় না। অর্থনৈতিক সাফল্য এমন হওয়া উচিত যাতে প্রতিটি নাগরিক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন যাপন করতে পারে এবং মর্যাদার সঙ্গে পরিবার পরিচালনা করতে পারে। কোটি কোটি মানুষের দারিদ্র্যের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে জামায়াত সুষম বণ্টন ও স্থিতিশীল বাজার ব্যবস্থার প্রস্তাবনা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপস্থিতি

জামায়াত আয়োজিত এই পলিসি সামিটটি দেশি-বেশি কূটনীতিক ও পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও পাকিস্তানসহ প্রায় ৩০টি দেশের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই বিপুল উপস্থিতি জামায়াতের প্রতি বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অংশীদারত্বের রাজনীতি

বক্তব্যের শেষে ডা. শফিকুর রহমান একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আগামীর চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাষ্ট্র ও নাগরিক, সরকারি ও বেসরকারি খাত এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যকার শক্তিশালী অংশীদারত্বের ওপর। তিনি পারস্পরিক সহযোগিতা ও যৌথ দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে একটি ইনসাফ কায়েমের আহ্বান জানান।

জামায়াতের নীতিগত রূপরেখার প্রধান ৫টি স্তম্ভ:

১. গণতান্ত্রিক রূপান্তর: স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠা।
২. অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার: কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে মূল রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ।
৩. মানবিক মর্যাদা: প্রবৃদ্ধি নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মানকে সাফল্যের মাপকাঠি ধরা।
৪. নারীর ক্ষমতায়ন: কাঠামোগত বাধা দূর করে নারীকে অর্থনৈতিক মূলধারায় যুক্ত করা।
৫. বৈশ্বিক অংশীদারত্ব: প্রবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে দক্ষতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে এ ধরণের একটি আন্তর্জাতিক মানের পলিসি সামিট আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। তারা কেবল একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দল নয়, বরং আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তাদের কাছে রয়েছে—সেটিই প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে এই সম্মেলনের মাধ্যমে।

এএন