বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সাধারণ তারিখ নয়, বরং এটি একটি জাতির পুনর্জন্মের সনদ হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের শেখ হাসিনা শাসনের অবসান এবং ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই প্রথম ব্যালট পেপারের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছে ১৭ কোটি মানুষ। গত ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া নির্বাচনী প্রচারণা দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে, যা গত দেড় দশকে ছিল অনুপস্থিত।
প্রেক্ষাপট, ধ্বংসস্তূপ থেকে গণতন্ত্রের পথে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়ন ও পরবর্তীকালে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য ছিল একটি স্বচ্ছ নির্বাচন। ড. ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের সময় রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুরোপুরি ভেঙে পড়া অবস্থায় পেয়েছিলেন। গত দেড় বছর ধরে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর পর অবশেষে নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করা হয়েছে।
ড. ইউনূস স্পষ্ট করে বলেছেন, আমি কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে আসিনি, বরং একটি ভঙ্গুর ব্যবস্থাকে মেরামত করে জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়াই আমার লক্ষ্য। তাঁর এই অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এবারের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায়, যাকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৬ সালের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করেছে।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও রাজনৈতিক মেরুকরণ এবারের নির্বাচনে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলো এখন রাজপথের প্রধান শক্তি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে গত ডিসেম্বরে দেশে ফেরা তারেক রহমানের নেতৃত্বে এখন সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। সিলেটের পুণ্যভূমি থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে তারেক রহমান প্রমাণ করেছেন যে, তৃণমূল পর্যায়ে এখনো জিয়ার পরিবারের জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ণ।
তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বিএনপির কর্মীদের মধ্যে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। ভোটারদের একটি বড় অংশ তাকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে আগামীর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছে।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হতে পারে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কঠোর দমন-পীড়নের শিকার হওয়া এই দলটি এখন ক্লিন ইমেজ ও সেবামূলক রাজনীতির স্লোগান নিয়ে সামনে আসছে। ঢাকার সমাবেশে ভোটারদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে যে, তারা একটি শক্তিশালী তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যারা গতানুগতিক ধারার বাইরে বিকল্প খুঁজছে, তাদের কাছে জামায়াত আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। অন্যদিকে গত মে মাসে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় এই নির্বাচনে কোনো প্রতীক নিয়ে অংশ নিতে পারছে না আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ এবং তাঁর ভারতে অবস্থান দলটিকে রাজনৈতিকভাবে বর্তমানে অস্তিত্বহীন করে তুলেছে।
জুলাই জাতীয় সনদ ও শাসনব্যবস্থার সংস্কার ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটটি কেবল সংসদ সদস্য নির্বাচনের নয়, এটি সংবিধান পরিবর্তনেরও নির্বাচন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক গণভোট। জুলাই জাতীয় সনদ নামক এই সংস্কার প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি যাতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে।
প্রস্তাবিত সংস্কারের মূল দিকগুলো হলো প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, সংসদ সদস্যদের জন্য সর্বোচ্চ দুই বা তিন মেয়াদের সময়সীমা নির্ধারণ এবং অর্থপাচার রোধে কঠোর আইনসহ স্বার্থের সংঘাত বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট নিরসনে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন। ২৫টি রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর করলেও ড. ইউনূসের সরকার চায় জনগণের সরাসরি রায়ের মাধ্যমে একে আইনি ভিত্তি দিতে। এটি কার্যকর হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসবে।
জেন-জি ও নতুন ভোটারদের ভূমিকা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ তরুণ, যাদের জেনারেশন জি বা ২০২৪ এর বিপ্লবের কারিগর বলা হয়। এই তরুণ ভোটাররাই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে। তারা কেবল কোনো দলের অনুসারী নয়, বরং তারা চায় জবাবদিহিতা, কর্মসংস্থান এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা। তাদের ভোট কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করছে বড় দলগুলোর জয়-পরাজয়।
অপপ্রচার ও ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জ নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই ড. ইউনূস দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সেখান থেকে ছড়ানো তথাকথিত ভুয়া নিউজ বা ফেইক নিউজ বাংলাদেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করার চেষ্টা করছে বলে সরকার মনে করছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কঠোরভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মনিটর বা পর্যবেক্ষণ করছে যাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে কেউ ভোট বিঘ্নিত করতে না পারে।
বৈশ্বিক নজরদারি ও প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এখন ঢাকার দিকে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর জোর দিচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই প্রথম বড় পরীক্ষা যেখানে প্রমাণ হবে বাংলাদেশ কি স্থিতিশীল গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে নাকি পুনরায় কোনো অস্থিরতার কবলে পড়বে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থার পরিবর্তনের সংগ্রাম। একদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বের পুনরুত্থান, অন্যদিকে জামায়াতের প্রভাব বৃদ্ধি এবং মাঝে ড. ইউনূসের সংস্কারবাদী এজেন্ডা, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রক্ত দিয়ে কেনা এই নতুন বাংলাদেশে জনগণ শেষ পর্যন্ত কাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়, তা দেখার জন্য এখন বিশ্ববাসীর অপেক্ষা।
জেএইচআর