ঢাকা-১৫ আসন

‘হেভিওয়েট’ বনাম ‘ঘরের ছেলে’—শফিকুল ইসলামের চ্যালেঞ্জ শফিকুর রহমানকে

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৪:০০ পিএম

ঢাকার নির্বাচনী মানচিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা-১৫ আসন (শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও মিরপুর এলাকা)। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় এই আসনটি এখন গোটা দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এর কারণ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং এক অসম শক্তির লড়াই। এই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের মুখোমুখি হয়েছেন বিএনপির এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা ও যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম খান।

রোববার সকালে রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় নির্বাচনী গণসংযোগকালে শফিকুল ইসলাম খান তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, এক প্রভাবশালী দলীয় প্রধানকে নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা মিরপুরের রাজনীতির অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

সকাল ১০টা নাগাদ কয়েকশ নেতাকর্মী নিয়ে প্রচারে নামেন বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান। এক দলীয় প্রধানের (জামায়াত আমির) বিপক্ষে লড়াই করাটা কতটা কঠিন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি অত্যন্ত কৌশলী ও আত্মবিশ্বাসী উত্তর দেন। শফিকুল বলেন, 'বাংলাদেশে এর আগেও অনেক বড় বড় দলীয় প্রধান আমাদের মতো নগণ্য কর্মীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। ইতিহাস তার সাক্ষী। তাই আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।'

তিনি মনে করেন, নির্বাচনে ভোটাররা প্রার্থীর পদমর্যাদা বা দলের শীর্ষ পদ দেখে নয়, বরং প্রার্থীর সাথে তাঁদের আত্মার সম্পর্ক দেখে ভোট দেবেন। শফিকুলের এই ‘নগণ্য কর্মী’ বনাম ‘দলীয় প্রধান’ তত্ত্বটি মিরপুরের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

শফিকুল ইসলাম খান তাঁর প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন নিজের ‘লোকাল আইডেন্টিটি’ বা স্থানীয় পরিচয়ের ওপর। শেওড়াপাড়া ও মিরপুর এলাকায় তাঁর বেড়ে ওঠা। তিনি নিজেকে বহিরাগত প্রার্থীর বিপরীতে ‘ঘরের ছেলে’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন।

গণসংযোগকালে তিনি রিকশাচালক থেকে শুরু করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চা বিক্রেতাদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কুশল বিনিময় করেন। শফিকুল বলেন, 'এই এলাকায় আমার জন্ম, এখানেই বড় হয়েছি। প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি অলিগলি এবং এখানকার প্রতিটি মানুষের নাড়ি আমার চেনা। এলাকার বাড়ির মালিক সমিতি বা ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এমন একজন প্রতিনিধি চায়, যার দরজা সব সময় খোলা থাকবে এবং যাকে ডাকলে পাশে পাওয়া যাবে।'

ঢাকা-১৫ আসনের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিয়ে শফিকুল ইসলাম খানের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি নির্বাচিত হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যে কাজগুলো করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

অবকাঠামো উন্নয়ন: মিরপুর এলাকার ভাঙা রাস্তাঘাট মেরামত এবং দীর্ঘদিনের গ্যাস ও পানির সংকট নিরসন।
জলাবদ্ধতা দূরীকরণ: একটু বৃষ্টি হলেই মিরপুরের রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ার যে চিরচেনা সমস্যা, তার স্থায়ী সমাধান।
খেলার মাঠ ও তরুণ প্রজন্ম: মাদক থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ নির্মাণ এবং তরুণদের সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা।

ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের এই মুখোমুখি লড়াইয়ের ফলে ভোটের সমীকরণ বেশ জটিল হয়ে পড়েছে। একদিকে জামায়াতের আমিরের সাংগঠনিক শক্তি এবং তাঁর সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী, অন্যদিকে বিএনপির শফিকুল ইসলামের তৃণমূল জনপ্রিয়তা ও ‘লোকাল সেন্টিমেন্ট’।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত ও বিএনপি উভয়েই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সহযোদ্ধা হলেও নির্বাচনী মাঠে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। শফিকুল ইসলামের ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাঙ্ক এবং তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা যদি কাজ করে, তবে এই আসনে এক বড় ধরণের নির্বাচনী অঘটনের সাক্ষী হতে পারে দেশবাসী।

মিরপুরের অলিগলি এখন পোস্টার আর স্লোগানে মুখর। শফিকুল ইসলাম খানের আজকের গণসংযোগ প্রমাণ করেছে যে, তিনি কেবল লড়াই করার জন্য মাঠে নামেননি, বরং জয়ের জন্য কোমর বেঁধে নেমেছেন। অন্যদিকে জামায়াত আমিরের নিরবতা ও কৌশলী অবস্থানও গভীর ইশারা দিচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট বক্সই বলে দেবে, মিরপুরবাসী কি কোনো ‘হেভিওয়েট’ দলীয় প্রধানকে বেছে নেবে, নাকি তাঁদের আপন ‘ঘরের ছেলে’র হাতেই তুলে দেবে এলাকার দায়িত্ব।

এএন