বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচারণার চিরাচরিত ধরণ আমূল বদলে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক। এক সময় প্রার্থীরা কেবল মাইকিং আর লিফলেটের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন তাঁদের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট। গবেষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, যার ভার্চ্যুয়াল শক্তি যত বেশি, তরুণ ভোটারদের কাছে তাঁর পৌঁছানোর সুযোগ ততটাই সহজ। তবে অনুসারীর সংখ্যাই কি ভোটের শেষ কথা? এ নিয়ে জনমনে রয়েছে নানা কৌতূহল।
ফেসবুক অনুসারীর লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর ভেরিফায়েড পেজে অনুসারীর সংখ্যা বর্তমানে ৫৬ লাখ। ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই পেজটি এখন বিএনপির ডিজিটাল প্রচারণার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তারেক রহমান এবার বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান-এর অনুসারী সংখ্যা ২৩ লাখ। ঢাকা-১৫ আসন থেকে নির্বাচনে লড়া এই নেতার পেজটিও বেশ সক্রিয়। নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আলোচনায় থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম-এর ফেসবুক অনুসারী সংখ্যাও চমকপ্রদ। তাঁর পেজে অনুসারী ১২ লাখ, তবে তাঁর ব্যক্তিগত ভেরিফায়েড আইডিতে এই সংখ্যা ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে।
দলীয় প্রধানদের ছাপিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছেন ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা। পেশায় চিকিৎসক ও সমাজকর্মী এই প্রার্থীর অনুসারী সংখ্যা ৭১ লাখ-এর বেশি। মজার বিষয় হলো, নির্বাচনের আগেই তিনি অনলাইনে 'ক্রাউড ফান্ডিং'-এর মাধ্যমে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা সংগ্রহ করে ডিজিটাল প্রচারণার এক নতুন উদাহরণ তৈরি করেছেন।
বিএনপি ও জামায়াতের জোটসঙ্গী এবং অন্যান্য দলের নেতাদের মধ্যেও রয়েছে অনুসারীর বড় বহর:
আন্দালিভ রহমান পার্থ (বিজেপি): ৩২ লাখ অনুসারী।
সারজিস আলম (এনসিপি): ৩১ লাখ অনুসারী।
হাসনাত আবদুল্লাহ (এনসিপি): ৩৪ লাখ অনুসারী।
নুরুল হক নুর (গণ অধিকার পরিষদ): ৯ লাখ ৭৫ হাজার।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বিএনপি): সাড়ে ৯ লাখ।
ববি হাজ্জাজ (এনডিএম): ৬ লাখ ৬১ হাজার।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং 'ডিজিট্যালি রাইট'-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরীর মতে, ফেসবুক প্রচারণার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো অত্যন্ত স্বল্প সময়ে এবং নির্দিষ্ট বয়সের (টার্গেটেড অডিয়েন্স) মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছানো যায়। কিন্তু এর মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহার করে গভীর নকল (Deepfake) ভিডিও ও ছবি ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে, যা ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৫৬ শতাংশ পরিবার এখন ইন্টারনেটের আওতায়। বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। অর্থাৎ বিশাল একটি অংশ এখনও ইন্টারনেটের বাইরে থাকলেও, তরুণ ও শহরকেন্দ্রিক ভোটারদের বড় একটি অংশ ফেসবুকের মাধ্যমেই প্রার্থীদের সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছেন।
নারী প্রার্থীদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা ৭ লাখ ২৯ হাজার অনুসারী নিয়ে বেশ শক্ত অবস্থানে আছেন। এছাড়া সানজিদা ইসলাম তুলি (৫৮ হাজার), দিলশানা পারুল (৬৪ হাজার) এবং ডা. মনীষা চক্রবর্তী (৩৪ হাজার) নিজ নিজ প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ফেসবুকের জনপ্রিয়তা জনসভার ভিড়ে রূপান্তরিত হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহদী জাহিনের মতে, ‘অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে প্রার্থীর যোগ্যতা বিচার করা যায় না। অনেক জনপ্রিয় প্রার্থীর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই, কিন্তু এলাকায় তাঁর বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে জমজমাট প্রচারণা। মাঠের রাজনীতির পাশাপাশি স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চলা এই 'লাইক-কমেন্ট-শেয়ার'-এর যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে কতটা প্রতিফলন ঘটায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিজিটাল বিপ্লব এখন আর কোনো সম্ভাবনা নয়, বরং এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা।
এএন