সিলেট-সুনামগঞ্জের নির্বাচনী বৈতরণীতে ‘প্রবাসী হাওয়া’: প্রচারণা ও অর্থায়নের নেপথ্য শক্তি

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৯, ২০২৬, ১১:২০ এএম

সিলেট এবং সুনামগঞ্জ—এই দুটি জেলার অর্থনীতির চাকা যেমন সচল থাকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে, তেমনি এবারের ভোটের মাঠও গরম হয়ে উঠেছে তাদের সরব উপস্থিতিতে। নির্বাচনী তফশিল ঘোষণার পর থেকেই হিথ্রো, জেএফকে কিংবা প্যারিসের চার্লস দ্য গল বিমানবন্দর থেকে সিলেটমুখী ফ্লাইটে প্রবাসীদের ভিড় বেড়েছে। তারা কেবল ভোট দিতে আসছেন না, বরং সাথে করে আনছেন নির্বাচনী খরচের বড় অংকের তহবিল এবং প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার বিশাল এক কর্মী বাহিনী।

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আবদুর রব কিংবা যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মোহাম্মদ আবুল হোসেনের মতো হাজারো মানুষ এখন সিলেট ও সুনামগঞ্জের অলিতে-গলিতে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তারা কেউ বিএনপির সমর্থক, কেউ জামায়াতে ইসলামীর, আবার কেউবা খেলাফত মজলিস কিংবা ইসলামী আন্দোলনের। প্রবাসে নাগরিক সুবিধা ভোগ করলেও দেশের রাজনৈতিক সংকট এবং পালাবদলের আকাঙ্ক্ষা তাদের টেনে এনেছে জন্মমাটির নির্বাচনী ময়দানে।

প্রবাসীদের এই উপস্থিতিতে নির্বাচনী প্রচারণায় ভিন্নমাত্রা যোগ হয়েছে। তারা কেবল প্রচারণা চালাচ্ছেন না, বরং প্রবাসের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ছোট ছোট উঠান বৈঠক এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রার্থীর পক্ষে জনমত গঠন করছেন। অনেক প্রবাসী ভোটার ২৫-৩০ বছর পর এবার দেশে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন, যা তাদের মধ্যে এক ধরনের উৎসবমুখর আমেজ তৈরি করেছে।

সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রার্থীদের বড় একটি অংশের তহবিলের উৎস হলো ‘প্রবাসী স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী’। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, সিলেটের ৬টি আসনের ৩৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৭ জনই তাদের নির্বাচনী ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রবাস থেকে পাচ্ছেন বলে উল্লেখ করেছেন।

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়—সিলেট-৬ আসনের একজন প্রার্থী তার সম্ভাব্য ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ের মধ্যে ৫০ লাখ টাকাই পাচ্ছেন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী স্বজনদের কাছ থেকে। একইভাবে সুনামগঞ্জের অনেক প্রার্থীর নির্বাচনী খরচের প্রায় পুরোটাই আসছে প্রবাস থেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসীদের এই আর্থিক সহযোগিতা স্থানীয় প্রার্থীদের ওপর চাপ কমিয়ে তাদের প্রচারণা আরও শক্তিশালী করছে।

এবারের নির্বাচনে প্রবাসীদের কেবল দাতা বা কর্মী হিসেবে দেখা যাচ্ছে না, তারা সরাসরি প্রার্থীর আসনেও বসেছেন। সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ মালিক দীর্ঘ ১৯ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থানের পর দেশে ফিরে দলের শীর্ষ মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়েছেন। একইভাবে মৌলভীবাজার-২ আসনেও মনোনয়ন পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শওকত হোসেন। সুনামগঞ্জ-৩ আসনে তো লড়াই হচ্ছে মূলত প্রবাসীদের মধ্যেই; সেখানে সাতজন প্রার্থীর মধ্যে চারজনই সরাসরি প্রবাস থেকে আসা। এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে, দলগুলো এখন মাঠের নেতার চেয়ে প্রবাসী নেতাদের অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

সুনামগঞ্জের রাজনীতিতে প্রবাসীদের আধিপত্য সিলেটের চেয়েও প্রকট। বিশেষ করে জগন্নাথপুর, শান্তিগঞ্জ ও ছাতক উপজেলায় ভোটারদের ওপর প্রবাসীদের প্রচণ্ড প্রভাব রয়েছে। সুনামগঞ্জ-৩ আসনের চিত্র সবচেয়ে মজার; সেখানে লড়াই করছেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সাবেক ট্রাস্টি এবং আইনজীবী ফোরামের নেতারা। এমনকি প্রার্থীরা নির্বাচনের আগে প্রবাসে গিয়ে প্রবাসীদের ‘দোয়া’ ও তহবিল নিশ্চিত করে আসছেন। শাহীনুর পাশা চৌধুরীর মতো প্রার্থীরা তো নিয়মিত জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে প্রবাসীদের সাথে নির্বাচনী কৌশল ঠিক করছেন।

সিলেটের মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই প্রবাসীদের পছন্দ করেন। কারণ, এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল এবং দুর্যোগকালীন সময়ে প্রবাসীরাই সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। তাই ভোটের মাঠে যখন কোনো প্রবাসী প্রার্থী হন বা কোনো প্রবাসীর সমর্থন থাকে, তখন সাধারণ ভোটাররা তাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন। জগন্নাথপুর উপজেলা নাগরিক অধিকার ফোরামের মতে, প্রবাসীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ জনসেবায় ব্যয় করেন বলেই এলাকায় তাদের প্রভাব অপরিসীম।

প্রবাসীরা সরব থাকলেও স্থানীয় অনেক বাসিন্দা বলছেন, পোস্টার লাগানো নিষেধ থাকায় এবং ডিজিটাল প্রচারণার আধিক্যের কারণে আগের মতো মিছিল-মিটিংয়ের উত্তাপ কম। তবে প্রার্থীরা কৌশল বদলে ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাচ্ছেন। সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুম চৌধুরী এবং জামায়াতের জেলা আমির হাবিবুর রহমান উভয়ই মনে করেন, উৎসবের আমেজ ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, প্রবাসীদের এই তৎপরতা ভোটারদের কেন্দ্রে টানতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সিলেট ও সুনামগঞ্জের নির্বাচন এখন আর কেবল স্থানীয় রাজনীতির বিষয় নয়, এটি একটি গ্লোবাল বা বৈশ্বিক ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। লন্ডন-নিউইয়র্কের ড্রয়িংরুমের আলোচনা এখন বিয়ানীবাজার বা দিরাইয়ের চায়ের দোকানে ঢেউ তুলছে। প্রবাসীদের শ্রম, অর্থ এবং আবেগ যেভাবে নির্বাচনী মাঠে মিশে গেছে, তাতে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়—সিলেট বিভাগের ফলাফল নির্ধারণে লন্ডনি আর আমেরিকান প্রবাসীরাই হবেন তুরুপের তাস।

এএন