শেখ হাসিনার ‘সোজা গুলি’র নির্দেশ: সজীব ওয়াজেদ জয়ের দাবি বনাম রূঢ় বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৯, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। সেই উত্তাল সময়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কাঠগড়ায়। সম্প্রতি আল-জাজিরায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় দাবি করেছেন, তাঁর মা কখনো হত্যার নির্দেশ দেননি। তবে একটি ফাঁস হওয়া ফোনালাপ এবং তৎকালীন পুলিশ প্রধানের সাক্ষ্য জয়ের এই দাবিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সাংবাদিকদের সাম্প্রতিক কলামের সূত্র ধরে এই বিতর্কের গভীরে গিয়ে সত্যতা সন্ধানের চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

সজীব ওয়াজেদ জয়ের মূল যুক্তি হলো, শেখ হাসিনা কেবল রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় এবং সশস্ত্র ‘সন্ত্রাসীদের’ দমনে লিথাল উইপন বা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন। আল-জাজিরার সঞ্চালক শ্রীনিবাসন জৈন যখন একটি অডিও রেকর্ডের কথা উল্লেখ করেন যেখানে হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, ‘সোজা গুলি করবে‘তখন জয় দাবি করেন এটি খণ্ডিত ও বিকৃতভাবে প্রচার করা হয়েছে।

জয়ের মতে, হাসিনা ছাত্রদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন এবং তাঁর নির্দেশ ছিল কেবল সেই সব দুর্বৃত্তদের জন্য যারা বিটিভি ভবন বা মেট্রোরেলের মতো স্থাপনায় আগুন দিচ্ছিল। কিন্তু এই ব্যাখ্যার আইনি ও বাস্তব ভিত্তি কতটা মজবুত?

১৮ জুলাই ২০২৪ রাত ১০টার দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ হয়। সেই আলাপনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করলে দুটি বিপরীতমুখী ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

সংকীর্ণ ব্যাখ্যা (জয়ের অনুকূলে): কথোপকথনে দেখা যায়, তাপস সচিবালয় ও আবাহনী ক্লাবে হামলার খবর দিচ্ছেন। হাসিনা এর জবাবে ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের কথা বলেন এবং লিথাল উইপন ব্যবহারের নির্দেশ দেন। এরপরই তিনি বলেন, তিনি এতক্ষণ বাধা দিয়ে রেখেছিলেন কারণ তিনি ‘ছাত্রদের সেফটি’র কথা ভেবেছিলেন। এটি জয়কে একটি যুক্তির জায়গা দেয় যে, হাসিনা ছাত্র ও সন্ত্রাসীদের আলাদা চোখে দেখছিলেন।

 বিস্তৃত ব্যাখ্যা (আদালতের দৃষ্টিতে): সমালোচক ও আইনবিদদের মতে, ‘সন্ত্রাসী’ তকমাটি ছিল তৎকালীন সরকারের একটি রাজনৈতিক বয়ান। বাস্তবে আন্দোলনরত ছাত্রদেরই ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি চেষ্টা সরকারের শীর্ষ মহলে ছিল। তাই ‘সন্ত্রাসীদের গুলি করার’ নির্দেশ কার্যত পুরো বিক্ষোভ দমনেরই এক অলিখিত লাইসেন্স হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

জয়ের দাবিকে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি। আইজিপি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার নির্দেশেই পুলিশকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ‘ওপেন ডিরেকশন’ দেওয়া হয়েছিল।

আইজিপি’র ভাষ্যমতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর এই সরাসরি নির্দেশ তাঁর কাছে পৌঁছে। এই নির্দেশের পরেই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ডিএমপি কমিশনারসহ সারা দেশে গুলির হুকুম চলে যায়। বার্গম্যানের মতে, আইজিপি সম্ভবত সেই নির্দেশনার কথাই বলছিলেন যা হাসিনা এবং তাপসের ফোনালাপে উঠে এসেছে। অর্থাৎ, এটি কেবল স্থাপনা রক্ষার জন্য কোনো ‘মৌখিক কথা’ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীতি।

একটি নির্দেশের বৈধতা কেবল তার শব্দের ওপর নয়, বরং তার পরিণতির ওপর নির্ভর করে। শেখ হাসিনার সেই ‘ওপেন নির্দেশনা’র প্রভাব ছিল ভয়াবহ। 

১৮ জুলাই: নির্দেশের পরেই পুলিশের গুলিতে নিহতের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে যায়।
১৯ জুলাই: প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু ঘটে।
২০ ও ২১ জুলাই: আরও প্রায় ১০০ জন প্রাণ হারান।

যদি হাসিনা সত্যিই কেবল ‘সন্ত্রাসী’ দমনের নির্দেশ দিতেন এবং পুলিশ যদি ভুল করে সাধারণ ছাত্রদের ওপর গুলি চালাত, তবে পরবর্তী কয়েক দিনে এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার কোনো নির্দেশ হাসিনা কেন দেননি? কেন কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতি-উৎসাহী হয়ে গুলি করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? এই নীরবতাই প্রমাণ করে যে, মাঠপর্যায়ে যা ঘটছিল তা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছারই প্রতিফলন ছিল।

ডেভিড বার্গম্যান উল্লেখ করেছেন যে, আল-জাজিরা বা বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে ফোনালাপের প্রেক্ষাপট কিছুটা এড়িয়ে গেলেও বাস্তব সত্যটি আরও অনেক গভীর। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দায়বদ্ধতার নীতি অনুযায়ী, শেখ হাসিনা দায় এড়াতে পারেন না। যদি তাঁর বাহিনী তাঁর নাম ব্যবহার করে গণহত্যা চালায় এবং তিনি তা দেখেও চুপ থাকেন, তবে আন্তর্জাতিক আইনে তিনি সরাসরি দায়ী।

সজীব ওয়াজেদ জয়ের যুক্তি কেবল একটি ফোনালাপের ‘ভাষাগত ব্যাখ্যা’র ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকতে পারে। কিন্তু যখন সেই ফোনালাপকে আইজিপি’র সাক্ষ্য, কয়েক দিনের লাগাতার মৃত্যু মিছিল এবং সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়, তখন জয়ের দাবি অন্তঃসারশূন্য মনে হয়।

হাসিনা সম্ভবত সচেতনভাবেই ‘ছাত্র’ ও ‘সন্ত্রাসী’ শব্দ দুটি ব্যবহার করেছিলেন যাতে পরবর্তীতে আইনি সুরক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু ইতিহাসের কাঠগড়ায় এবং ট্রাইব্যুনালের নথিতে এই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর দায় কেবল ‘সন্ত্রাসী দমন’ বলে চালিয়ে দেওয়া কঠিন হবে।

এএন