ধর্ম বনাম ধর্মের রাজনীতি: ফারাও আমল থেকে আজকের বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৯, ২০২৬, ০১:১০ পিএম

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে একটি সত্য বারবার নগ্ন হয়ে ধরা দেয়—ধর্ম কখনো মানুষের অধিকার হরণ করে না, কিন্তু ধর্মের ‘লেবাস’ পরা রাজনীতি বরাবরই মানুষের স্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করেছে। তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরের থিবিস থেকে শুরু করে আজকের ঢাকা কিংবা ওয়াশিংটন—স্থান-কাল-পাত্রভেদে দৃশ্যপট বদলালেও শোষণের কৌশলটি একই রয়ে গেছে। দেবতার দোহাই দিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সেই প্রাচীন খেলা আজও আধুনিক রাজনীতির মোড়কে সমানে চলছে।

প্রাচীন মিসরে ফারাও রামসিস যখন কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতেন, তখন তিনি সরাসরি নিজের দায় নিতেন না। তিনি যেতেন দেবতা আমুনের প্রতিনিধি হেরিহরের কাছে। আমুন কথা বলতেন না, কিন্তু হেরিহর মাথা নেড়ে ‘ঐশ্বরিক অনুমোদন’ দিতেন। এই যে ধর্মের কাঁধে বন্দুক রেখে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি, এটিই হলো ধর্মের রাজনীতিকরণের আদিমতম উদাহরণ। এখানে ধর্ম ছিল কেবল একটি ‘ভ্যালিডেশন টুল’ বা বৈধতা পাওয়ার হাতিয়ার। আজ যখন কোনো রাজনৈতিক নেতা বলেন যে তাঁকে ভোট না দেওয়া মানে ঈশ্বরের অবাধ্য হওয়া, তখন তিনি আসলে সেই প্রাচীন হেরিহরেরই আধুনিক সংস্করণ হিসেবে আবির্ভূত হন।

গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের মহড়া শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে মাওলানা মওদুদীর নেতৃত্বে যে আহমদিয়াবিরোধী দাঙ্গা হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ধর্মরক্ষা ছিল না, বরং ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের গদি নাড়িয়ে দেওয়া। চাপের মুখে পড়ে লিয়াকত আলী খান ১৯৪৯ সালে ‘অবজেক্টিভ রেজুলেশন’ পাশ করেন। ইতিহাসবিদ আয়েশা জালালের মতে, এই একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই পাকিস্তানে রাষ্ট্র ও ধর্মের সীমানা মুছে যায় এবং উলেমাদের হাতে রাজনীতির চাবিকাঠি তুলে দেওয়া হয়। এর করুণ পরিণতি আমরা আজও পাকিস্তানে শিয়া মসজিদে বোমা হামলা কিংবা আহমদিয়াদের প্রান্তিকীকরণের মধ্য দিয়ে দেখতে পাচ্ছি।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, তথাকথিত উন্নত বিশ্বের প্রতিচ্ছবি যুক্তরাষ্ট্রেও আজ একই চিত্র। সেখানে ডানপন্থী মতাদর্শের প্রসারে জুডেও-খ্রিষ্টান চেতনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাঠাগার থেকে বই পুড়িয়ে ফেলা, খ্রিষ্টীয় চেতনার পরিপন্থী মনে করে শিক্ষক বা শিল্পীদের ওপর হামলা চালানো—এসবই সেই রাজনীতির ফল যা ধর্মকে নিজের ‘প্রাইভেট প্রপার্টি’ মনে করে। জেমস ম্যাডিসন ও টমাস জেফারসন যে সীমারেখার কথা বলেছিলেন, আজ তা মার্কিন রাজনীতিতেও বিপন্ন।

আজকের বাংলাদেশে নির্বাচন বা ক্ষমতার রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা কয়েক গুণ বেড়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর নামের সাথে ধর্মের নাম জুড়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যই হলো সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করা।

এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। ফেসবুকে কোনো পোস্ট বা নিছক গুজবের ওপর ভিত্তি করে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা চালানো এখন এক ভয়াবহ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। একইভাবে নারীদের ঘরে বন্দী করে রাখার যে নব্য ফতোয়া, তা আদতে কোনো ধর্মীয় নির্দেশ নয়, বরং এটি নারীদের শ্রমবাজার ও শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি সুপরিস্থ রাজনৈতিক কৌশল। তিউনিসিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা তুরস্কের মতো মুসলিমপ্রধান দেশগুলো যখন নারীর ক্ষমতায়নকে প্রাধান্য দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশে নারীদের ‘পাঁচ ঘণ্টা’ কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া বা তাদের চলাচলের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা মধ্যযুগীয় অন্ধকারকেই ইঙ্গিত করে।

আমরা ভুলতে পারি না ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা। সেই ভয়াবহ গণহত্যাও চালানো হয়েছিল ধর্মের লেবাস চড়িয়ে। যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে সেদিন মানুষ মেরেছিল, তারা আজও সেই একই কৌশল ব্যবহার করে আধুনিক শিক্ষা, সংস্কৃতি, গান, নাটক আর মাজারের ওপর আঘাত হানছে। তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট—মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা রুদ্ধ করে একটি অন্ধ অনুসারী গোষ্ঠী তৈরি করা।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এই অপশক্তির সমাধান কোথায়? উত্তরটি কেবল আইনি নয়, বরং সামাজিক। এক সাংবাদিক তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, সম্মিলিত প্রতিবাদই পারে এই অন্ধকারের দেয়াল ভাঙতে। জয়পুরহাটে মেয়েদের ফুটবল খেলা বন্ধের চেষ্টা কিংবা নারায়ণগঞ্জে লালন মেলা ঠেকানোর অপচেষ্টা—সবই ভেস্তে গেছে যখন সাধারণ মানুষ দল বেঁধে রাজপথে নেমেছে। ধর্ম নিয়ে কথা বলার একচেটিয়া অধিকার যখন আমরা কেবল ‘পেশাদার ধর্মব্যবসায়ী’দের হাতে ছেড়ে দিই, তখনই সমস্যা জটিল হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সেই সতর্কবাণী আজও প্রাসঙ্গিক—ধর্মের নামে ফতোয়া দেওয়ার অধিকার কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেওয়া বোকামি। আমাদের মধ্যে এমন কণ্ঠস্বর প্রয়োজন যারা ধর্মের সঠিক ও মানবিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাবে।

রাজনীতিবিদরা ডানে থাকুন বা বামে, ক্ষমতার লোভ তাদের অনেক সময়ই ধর্মের পিঠে চড়ে বসতে প্ররোচিত করে। কিন্তু এই জনপদ হাজার বছরের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির। এখানে লালন আর হাসন রাজার সুর যেমন আছে, তেমনি আছে সম্প্রীতির দীর্ঘ ইতিহাস। ধর্মকে যারা রাজনীতির পণ্য বানাতে চায়, তাদের পরাজিত করার একমাত্র পথ হলো সমস্বরে প্রতিবাদ। যে চাবুক আজ তারা আমাদের দিকে উঁচিয়ে ধরছে, সেই চাবুক আমাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের শক্তিতে কেড়ে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সমস্যা ধর্মে নেই; সমস্যা সেই ক্ষুদ্র মনের মানুষদের মধ্যে যারা ব্যক্তিগত আখের গোছাতে ধর্মকে কলুষিত করছে।

এএন