কৃষিঋণ মওকুফ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা তারেক রহমানের

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম

তীব্র শীত আর কুয়াশাকে উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষের স্লোগানে আজ মুখরিত ছিল ঠাকুরগাঁওয়ের রাজপথ। নীলফামারীর সৈয়দপুর হয়ে হেলিকপ্টারে বেলা সাড়ে ১১টায় ঠাকুরগাঁও পৌঁছান তিনি। মঞ্চে উঠেই তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। ২০০৩ সালের পর এই প্রথম তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে সরাসরি জনগণের সামনে দাঁড়ালেন। তাঁর বক্তৃতায় উঠে এসেছে জুলাই বিপ্লবের শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং কৃষিপ্রধান উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা।

উত্তরাঞ্চল তথা ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় এলাকা মূলত কৃষিনির্ভর। এখানকার প্রান্তিক কৃষকদের ঋণের বোঝা লাঘব করতে তারেক রহমান এক অভাবনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি ধানের শীষ জয়যুক্ত হয়, তবে আমরা প্রান্তিক কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করব। শুধু সরকারি ঋণ নয়, দুস্থ ও অসহায় মানুষ এনজিও থেকে যে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কিস্তির চাপে পিষ্ট হচ্ছেন, সেই ঋণও জনগণের পক্ষ থেকে সরকার পরিশোধ করবে বলে তিনি ঘোষণা দেন। কৃষকদের ভাগ্য বদলাতে এই অঞ্চলে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার (Cold Storage) স্থাপনের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

নারীদের ঘরোয়া কাজের স্বীকৃতি এবং তাঁদেরকে পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করতে তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন 'ফ্যামিলি কার্ড'।

প্রত্যেক ঘরে কার্ড: দেশের প্রতিটি গৃহিণীর কাছে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে।

মাসিক ভাতা: কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে সরাসরি মা-বোনদের হাতে আর্থিক সহযোগিতা পৌঁছে দেবে সরকার, যাতে তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চালাতে পারেন এবং ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন।

তারেক রহমান বলেন, নারীদের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ছাড়া একটি রাষ্ট্র কখনোই সমৃদ্ধ হতে পারে না। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া বিনা মূল্যে নারী শিক্ষার সুযোগ দিয়েছিলেন, আমরা তাঁদের হাতে এখন অর্থনৈতিক শক্তি দিতে চাই।

ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড়ের বন্ধ হয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রগুলোকে পুনরায় প্রাণবন্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান।

শিল্পায়ন: ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের চিনিকল, রেশম কারখানা এবং চা শিল্পকে আধুনিকায়ন করে আবার চালু করা হবে।

পরিবহন: ঠাকুরগাঁওয়ের দীর্ঘদিনের দাবি বন্ধ বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু করার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান তিনি।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: ঠাকুরগাঁওয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং ক্যাডেট কলেজ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এছাড়াও গ্রামীণ মানুষের দৌড়গোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে প্রতিটি গ্রামে 'হেলথকেয়ার' কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

বক্তৃতার শুরুতেই তারেক রহমান ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। মঞ্চের পাশে বসা শহীদ পরিবারের সদস্যদের দেখিয়ে তিনি বলেন, এঁরা স্বজন হারিয়েছেন কেবল আপনাদের ভোটের অধিকার এবং কথা বলার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। তাঁদের এই আত্মদানকে আমরা বৃথা যেতে দেব না। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পাওয়া স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হলে আমাদের এখন দেশ পুনর্গঠন করতে হবে।

তারেক রহমান স্পষ্ট করে দেন যে, বিএনপির আগামীর বাংলাদেশে ধর্মের ভিত্তিতে নয়, বরং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে মানুষের মূল্যায়ন হবে। তিনি বলেন, হাজার বছর ধরে এ দেশে সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে আছে। আগামীতেও প্রত্যেকে নিরাপদ থাকবে। কাউকে তাঁর ধর্ম দিয়ে নয়, বরং তাঁর যোগ্যতা দিয়ে বিচার করা হবে।

বক্তব্য শেষে তারেক রহমান ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুরের ছয়জন সংসদীয় পদপ্রার্থীকে জনতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি প্রার্থীদের উদ্দেশে বলেন, নির্বাচিত হলে আপনাদের দায়িত্ব হবে ২৪ ঘণ্টা জনগণকে দেখে রাখা।শআর ভোটারদের প্রতি তাঁর আহ্বান, আপনারা ধানের শীষে ভোট দিয়ে দেশ গঠনের সুযোগ দিন। কারণ, জনগণের মালিকানা ছাড়া দেশ পুনর্গঠন সম্ভব নয়।

তারেক রহমানের এই সফর ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতির চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তাঁর দেওয়া ‘১০ হাজার টাকা কৃষিঋণ মওকুফ’ এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মতো গণমুখী কর্মসূচিগুলো সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ও নারী ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উত্তরবঙ্গের এই দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির পালে নতুন হাওয়া দেবে।

এএন