৫০ লাখ টাকাসহ আটক জেলা জামায়াতের আমির হাসপাতালে ভর্তি

নীলফামারী প্রতিনিধি  প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৪:১২ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। দেশ যখন ভোটের আমেজে বুঁদ, তখনই নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ঘটে গেল এক নজিরবিহীন ঘটনা। বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে ধরা পড়লেন ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির বেলাল উদ্দিন প্রধান। বুধবার বেলা ১১টার এই ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন উত্তরের এই জনপদ।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নজরদারি বাড়ায় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ঢাকা থেকে আসা একটি বেসরকারি বিমানে অবতরণ করেন বেলাল উদ্দিন প্রধান। তার সঙ্গে ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের দপ্তর সম্পাদক আবদুল মান্নান। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার মুহূর্তেই তাদের গতিরোধ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, তাদের কাছে আগে থেকেই তথ্য ছিল যে একটি ফ্লাইটে বড় অংকের টাকা নিয়ে কেউ আসছেন। ব্যাগ তল্লাশি করতেই বেরিয়ে আসে থরে থরে সাজানো নোটের বান্ডিল।

নীলফামারীর পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আটক ব্যক্তি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে তার ব্যাগে থাকা অর্থের পরিমাণ ৫০ লাখ টাকারও বেশি। পুলিশ সুপারের ভাষায়, আটক ব্যক্তি নিজেই অর্থের অংক অর্ধ কোটি ছাড়ানোর কথা বলেছেন। তবে সঠিক পরিমাণ জানতে সবার উপস্থিতিতে টাকাগুলো স্বচ্ছতার সঙ্গে গুনে দেখা হবে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ব্যাগে অন্তত ৪০ থেকে ৬০ লাখ টাকা থাকতে পারে।

আটকের পর বেলাল উদ্দিন প্রধানকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হয়। সেখানে তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে জানান, তিনি ঠাকুরগাঁও সদরের হাজীপাড়ার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন শিক্ষক। টাকার উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, এটি তার গার্মেন্টস ব্যবসার টাকা। তবে কোনো ধরনের রসিদ বা প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র তাৎক্ষণিকভাবে দেখাতে পারেননি তিনি।

জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালীনই হঠাৎ তিনি অসুস্থবোধ করেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় তাকে দ্রুত কড়া নিরাপত্তায় সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সেখানে পুলিশি পাহারায় তার চিকিৎসা চলছে।

ভোটের মাত্র একদিন আগে এই পরিমাণ অর্থ পরিবহনের বিষয়টি অত্যন্ত 'সংবেদনশীল' বলে মনে করছে স্থানীয় প্রশাসন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে এই অর্থ নির্বাচনের মাঠে ভোটারদের প্রভাবিত করতে বা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল কি না।

নীলফামারীর পুলিশ সুপার বলেন, নির্বাচনী পরিবেশে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বহন কেবল একটি আইনগত বিষয় নয়, এটি নিরাপত্তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অর্থের উৎস এবং এর ব্যবহারের গন্তব্য তদন্ত করছি।

এই আটকের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, এটি জামায়াত নেতাদের প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটি সাজানো নাটক। তাদের মতে, ব্যবসা বা পারিবারিক প্রয়োজনে টাকা বহন করা অপরাধ নয় এবং বিমানবন্দরের অনাপত্তিপত্রও তাদের কাছে ছিল। অন্যদিকে, জামায়াত আমির শফিকুর রহমান ফেসবুক পোস্টে ভোটারদের বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বেলাল উদ্দিন প্রধান ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতির একজন পরিচিত মুখ। সম্প্রতি ২৩ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন, যেখানে কেন্দ্রীয় জামায়াত আমির বক্তব্য রাখেন। এমন একজন প্রভাবশালী নেতার আটকের ঘটনা ঠাকুরগাঁও এবং নীলফামারী অঞ্চলে নির্বাচনের ভোট সমীকরণে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই অর্থের প্রকৃত উৎস নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তবে নির্বাচনের আগমুহূর্তে এই 'ক্যাশ ক্যালেঙ্কারি' যে ভোটারদের মধ্যে একটি নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণের দিন এই ঘটনার কোনো রেশ নির্বাচনী ময়দানে পড়ে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

এএন