নির্বাচন ঘিরে জামায়াত জোয়ার, ২৬-এ কি ১৯৯১-এর পুনরাবৃত্তি!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম

বাংলাদেশের নির্বাচনী মানচিত্রে গত কয়েক দশকে প্রধান দুটি মেরু ছিল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী দেড় বছরে সেই সমীকরণ অনেকটা ওলটপালট হয়ে গেছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ‘জামায়াতে ইসলামী’ যে সাংগঠনিক তৎপরতা ও জনসমর্থনের আবহ তৈরি করেছে, তাকে অনেকে ‘অর্গানিক জোয়ার’ বলছেন, আবার কেউ কেউ একে কেবলই ‘সোশ্যাল মিডিয়া হাইপ’ হিসেবে দেখছেন।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবার ধারণা ছিল আওয়ামী লীগই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। কিন্তু ভোটের ফলাফল সবাইকে চমকে দিয়েছিল। ঠিক তেমনিভাবে, ২০২৬-এর এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, মাঠের প্রচারণায় জামায়াত কি বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে? নির্বাচনের আগে পরিচালিত একাধিক জরিপে জামায়াতের জনসমর্থন পূর্বের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। অনেক সাধারণ মানুষ এখন বলছেন, ‘সব দলই তো দেখলাম, এবার না হয় দাঁড়িপাল্লা দেখি।’ এই আকাঙ্ক্ষাই মূলত জামায়াতকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিএনপি তৃণমূল পর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দলের কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় আমির ডা. শফিকুর রহমানের গতিশীল নেতৃত্ব এবং দলের প্রশ্নাতীত সাংগঠনিক শৃঙ্খলা সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। বিএনপির তৃণমূলের কোন্দল ও অনুপ্রবেশকারীদের দাপটে অনেক ত্যাগী ও নির্যাতিত বিএনপি কর্মীও এখন জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ছেন।

বিগত দেড় বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের অভূতপূর্ব সাফল্য জামায়াতের মূল দলের জন্য সঞ্জীবনী সুধা হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের প্রতি একটি স্পষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে আবার সেই পুরোনো ‘ছাত্রলীগ ঘরানার’ জবরদস্তিমূলক রাজনীতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। এই ভীতিকে পুঁজি করে জামায়াত তাদের ক্লিন ইমেজের রাজনীতি তরুণদের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আসিফ মোহাম্মদ শাহানের মতে, বিভিন্ন জরিপে জামায়াতের প্রতি ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতি (FPTP) বা সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত বিজয়ী হওয়ার কাঠামোতে এই সমর্থন সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোট সারা দেশে ছড়িয়ে থাকলে তা বড় দলের আসন সংখ্যা কমাতে পারে ঠিকই, কিন্তু নিজস্ব আসন হিসেবে ১৫০টি ম্যাজিক ফিগার ছোঁয়া জামায়াতের মতো দলের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

জামায়াতের এবারের প্রচারণায় ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীককে মানুষের মগজে গেঁথে দেওয়ার একটি সফল প্রচেষ্টা দেখা গেছে। বিশেষ করে নারী জামায়াত কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা বেশ ফলদায়ক হয়েছে। তবে এই প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। ‘দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে জান্নাত’—জাতীয় এই ধরনের প্রচারণার কথা স্থানীয় পর্যায়ে শোনা গেলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন। জামায়াত তাদের নাম ব্যবহারের চেয়ে প্রতীকের নাম প্রচারেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, যা সাধারণ ভোটারদের জন্য মনে রাখা সহজ হয়েছে।

বিএনপি এবার এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে অসংগতি এবং মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির অন্তত ৭০ জন বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ ফাটল সরাসরি জামায়াতের পালে হাওয়া দিচ্ছে। বাগেরহাট বা খুলনার মতো অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে, নির্যাতিত বিএনপি কর্মীরাই এখন সংক্ষুব্ধ হয়ে জামায়াত প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় জামায়াতের সুসংগঠিত উপস্থিতি এক ধরণের কৃত্রিম প্রভাব বা ‘হাইপ’ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের মাত্র অর্ধেক মানুষ ইন্টারনেটের আওতায় এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী তার চেয়েও কম। ফলে এই ভার্চুয়াল জোয়ার গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের ‘সাইলেন্ট ভোটার’দের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো অনিশ্চিত। সংখ্যালঘু ভোটার ও আওয়ামী লীগের বড় একটি নীরব ভোটব্যাংক শেষ পর্যন্ত কোন দিকে হেলে পড়ে, তার ওপরই নির্ভর করছে চূড়ান্ত ফলাফল।

ভোটের আগের দিন পর্যন্ত যে জামায়াত সমর্থনের জোয়ার দৃশ্যমান, তা কি কেবল আসন বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি ১৯৯১ সালের বিএনপির মতো সরকার গঠনের জায়গায় পৌঁছাবে—তা নিয়ে তর্ক চলছেই। তবে বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক ভিত্তি সম্পন্ন বিএনপিই শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকবে। কিন্তু জামায়াত যদি ২০-২৫ শতাংশের বেশি আসন পেয়ে যায়, তবে সেটি বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতিতে এক নতুন শক্তির মেরুকরণ ঘটাবে।

এএন