বিএনপির ইশতেহার: আশার আড়ালে একগুচ্ছ অমীমাংসিত প্রশ্ন ও উদ্বেগের জায়গা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম

রাজনীতিতে ইশতেহার মানেই একঝুড়ি প্রতিশ্রুতি। কিন্তু জনমনে প্রশ্ন থাকে—এই প্রতিশ্রুতিগুলো কি কেবলই ভোটের রাজনীতি, নাকি দিন বদলের দলিল? বিএনপি তাদের এবারের ইশতেহারে গণতন্ত্র, অর্থনীতি এবং সুশাসনের নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও এর গভীরে তাকালে দেখা যায় অনেক অস্পষ্টতা এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থান। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের পদ্ধতিগত দিকগুলোতে বিএনপি যে অবস্থান নিয়েছে, তা নিয়ে নাগরিক সমাজে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিএনপি তাদের ইশতেহারে ‘মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস’ তুলে ধরার কথা বলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘সঠিক ইতিহাস’ শব্দবন্ধটি অধিকাংশ সময়ই রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আওয়ামী লীগ বা জামায়াতের মতো বিএনপিও যদি নিজেদের দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস সংকলন করে, তবে তা নতুন কোনো বিভেদই তৈরি করবে। ইশতেহারে এই ইতিহাস রচনার জন্য কোনো স্বাধীন বা নির্মোহ মেকানিজমের কথা উল্লেখ করা হয়নি, যা এই প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের ধারণাটি বিএনপির ইশতেহারের অন্যতম আকর্ষণ। তারা উচ্চকক্ষে বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীদের আনতে চায়। কিন্তু গোলকধাঁধাটা অন্য জায়গায়—এই প্রতিনিধিদের নির্বাচনের মানদণ্ড কী হবে? যদি নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যার অনুপাতে রাজনৈতিক দলগুলোই উচ্চকক্ষে প্রতিনিধি পাঠায়, তবে তা কেবল দলীয় পুনর্বাসনের কেন্দ্র হয়ে উঠবে। উচ্চকক্ষ কীভাবে নিম্নকক্ষের ওপর ভারসাম্য বজায় রাখবে (Check and Balance), তার কোনো পরিষ্কার রূপরেখা এখানে অনুপস্থিত।

বিএনপি বলেছে, সম্পাদিত আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পর্কে জাতীয় সংসদকে অবহিত করা হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি সম্পাদনের পর অবহিত করলে তো কোনো লাভ নেই। প্রয়োজন হলো চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে সংসদে বিতর্ক এবং জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। গোপনীয়তার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সাহসী প্রতিশ্রুতি বিএনপির পররাষ্ট্রনীতিতে মেলেনি।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং মব জাস্টিস বা গণপিটুনির বিচারের বিষয়ে বিএনপি কোনো সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করেনি। এনসিপি বা জামায়াতের মতোই বিএনপি এই স্পর্শকাতর জায়গাটিতে এক ধরনের ‘ব্ল্যাংক চেক’ বা দায়মুক্তির অবস্থান নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়াও রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রদর্শনের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারের সম্মতির বিষয়টিও তারা এড়িয়ে গেছে।

বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছে, কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে বরখাস্ত করা যাবে না। আপাতদৃষ্টিতে এটি গণতান্ত্রিক মনে হলেও বাস্তবে এর ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে। আদালতের চূড়ান্ত রায় আসতে বছরের পর বছর সময় লাগে।

এই সময়ে একজন অপরাধী বা দুর্নীতিবাজ প্রতিনিধি পদে বহাল থেকে প্রমাণ নষ্ট করতে পারেন বা মামলার বাদীকে হুমকি দিতে পারেন। এই ঝুঁকি মোকাবিলার কোনো রক্ষাকবচ ইশতেহারে রাখা হয়নি।

বিএনপি একদিকে বলছে তারা ‘অর্থনীতির উদারীকরণ’ বা মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করবে, অন্যদিকে তারা বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ও চিনিকল পুনরায় চালু করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এই দুটি অবস্থান সরাসরি সাংঘর্ষিক। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে রাষ্ট্র সাধারণত লোকসানি প্রতিষ্ঠান চালায় না। এছাড়া জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সুরক্ষার কোনো নির্দিষ্ট রোডম্যাপ ইশতেহারে অনুপস্থিত।

২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান ২০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বললেও বিএনপি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নীরব। রামপাল বা রূপপুরের মতো বিতর্কিত ও পরিবেশবিনাশী বড় প্রকল্পগুলো নিয়ে দলটির কোনো স্পষ্ট অবস্থান নেই। বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির স্তর রক্ষায় আধুনিক ‘রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং’-এর পরিবর্তে পুরোনো আমলের খাল খননের কথা বলা হয়েছে, যা বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতিতে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে পরিবেশবিদদের সংশয় রয়েছে।

পাহাড়ের জন্য বিএনপি ‘এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন’ গড়ার কথা বলেছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, পর্যটন বিকাশের নামে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। এই জোনের ফলে পাহাড়ি জাতিসত্তাগুলোর স্বকীয়তা রক্ষা হবে নাকি তারা আরও কোণঠাসা হবে, ইশতেহারে তার কোনো গ্যারান্টি দেওয়া হয়নি।

বিএনপির ইশতেহার পর্যালোচনায় দেখা যায়, তারা অনেক ভালো কথা বললেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কারের চেয়ে জনপ্রিয় স্লোগানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের অনীহা দলটির স্বচ্ছতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। দিনশেষে ইশতেহারের ৪৮ পৃষ্ঠা কেবল তখনই সার্থক হবে, যখন তা সাধারণ মানুষের জীবনে কার্যকর পরিবর্তন আনবে। অন্যথায় এটি কেবল আরেকটি নির্বাচনের প্রাক্কালে দেওয়া রঙিন আশ্বাসের দলিল হয়েই থেকে যাবে।

এএন