ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) এক অভাবনীয় চমক দেখিয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই নতুন দলটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের শরিক হিসেবে প্রথমবারের মতো ভোটে অংশ নিয়েই ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় পেয়েছে।
গত ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত এই দলটি ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে নিজেদের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করেছে। বেসরকারিভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দলটির শীর্ষস্থানীয় ছয়জন নেতা সংসদ সদস্য হিসেবে জয়লাভ করেছেন।
রাজধানীর ঢাকা-১১ আসনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এক শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই শেষে জয়ী হয়েছেন। তিনি বিএনপির প্রভাবশালী প্রার্থী এম এ কাইয়ুমকে মাত্র ২ হাজার ৩৯ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।
নাহিদ ইসলাম (এনসিপি) ৯৩,৮৭২ ভোট। এম এ কাইয়ুম (বিএনপি) ৯১,৮৩৩ ভোট। বিজয় ব্যবধান ২,০৩৯ ভোট।
এই আসনে মোট ৪৩ শতাংশ ভোট পড়েছে এবং নাহিদ ইসলামের এই বিজয় রাজধানীর রাজনীতিতে এনসিপির এক বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন রংপুর-৪ আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। এই আসনে তিনি বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বড় জয় ছিনিয়ে নেন।
আখতার হোসেন (এনসিপি) ১,৪৯,৯৬৬ ভোট। এমদাদুল হক ভরসা (বিএনপি) ১,৪০,৫৬৪ ভোট। আবু নাসের (জাপা) ৩৩,৬৬৪ ভোট।
রংপুর অঞ্চলে এনসিপির এই জয় প্রমাণ করে যে, উত্তরাঞ্চলেও তরুণ নেতৃত্বের প্রতি ভোটারদের গভীর আস্থা তৈরি হয়েছে।
কুমিল্লা-৪ আসনে এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহর জয় ছিল দেখার মতো। তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ (এনসিপি): ১,৬৬,৫৮৩ ভোট। জসিম উদ্দিন (গণঅধিকার পরিষদ): ৪৯,৮৮৫ ভোট।
কুমিল্লার এই বিশাল জয় হাসনাত আবদুল্লাহর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং এনসিপির সাংগঠনিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ।
নোয়াখালী-৬ আসন থেকে এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ বিজয়ী হয়েছেন। তিনি ২৭ হাজার ৮৭৮ ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন।
আবদুল হান্নান মাসউদ (এনসিপি): ৯১,৮৯৯ ভোট। মাহবুবের রহমান (বিএনপি): ৬৪,০২১ ভোট।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ধানের শীষ সমর্থিত জোটের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমীকে ২৫ হাজার ৫৫২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। বিজয়ের পর তিনি এলাকাকে মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
কুড়িগ্রাম-২ আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর জয়ী হয়েছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুর রহমান মোজাহিদ। তিনি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৮৬৯ ভোট পেয়ে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদকে পরাজিত করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বিএনপি ও তার মিত্ররা ২১২টি আসনে এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট ৭টি আসনে জয় পেয়েছে (যার মধ্যে এনসিপির ৬টি)। এনসিপি মোট ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৬টিতে জয়ী হওয়া দলটির জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এনসিপির এই ছয় নেতার সংসদে যাওয়া বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সংকেত। তারা রাজপথের আন্দোলন থেকে উঠে এসে ব্যালটের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেলেন, যা সংসদীয় গণতন্ত্রে তারুণ্যের বড় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।
এএন