ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পরাজয় মেনে নিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে রাজপথে এবং সংসদে সক্রিয় থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
শনিবার দিবাগত গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে তিনি দলের অবস্থান পরিষ্কার করেন। এই ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা ছিল যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামী এই ফলাফলকে কীভাবে গ্রহণ করবে। সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শুক্রবার দিবাগত রাত ১টা ৪৪ মিনিটে ডা. শফিকুর রহমান তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক বার্তায় জানান, জামায়াত সামগ্রিক নির্বাচনী ফলাফলকে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।
তিনি বলেন, যেকোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক যাত্রায় নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা কেবল প্রচারণায় নয়, বরং জনগণের রায়কে আমরা কীভাবে গ্রহণ করি তার ওপর নির্ভর করে। শুরু থেকেই আমরা একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম, সেই প্রতিশ্রুতিতে আমরা আজও অটল।
নির্বাচনী ফলাফলে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও জামায়াতের পারফরম্যান্স রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চমকে দিয়েছে। এবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট মোট ৭৭টি আসনে জয়ী হয়েছে, যার মধ্যে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আসন পেয়েছে। ডা. শফিকুর রহমান এই অর্জনকে একটি ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি হতাশ নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতে গিয়ে বলেন, তিনি জানেন কর্মীরা আজ ব্যথিত এবং গভীরভাবে হতাশ। যখন কেউ কোনো আদর্শের পেছনে নিজের হৃদয় ঢেলে দেয়, তখন তার ফলাফল তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। তবে এই প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি। ৭৭টি আসন নিয়ে জামায়াত সংসদে উপস্থিতি প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি করেছে এবং আধুনিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম শক্তিশালী বিরোধী ব্লকে পরিণত হয়েছে।
রাজনীতিতে উত্থান-পতনকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির গত দেড় দশকের সংগ্রামের উদাহরণ টানেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৮ সালে বিএনপি মাত্র ৩০টি আসনে নেমে এসেছিল। সেখান থেকে দীর্ঘ ১৮ বছরের কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে ২০২৬ সালে তারা আজ সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতি একটি দীর্ঘ পথ। আমাদের পথ এখন পরিষ্কার, মানুষের আস্থা অর্জন করা, ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং দায়িত্বশীলভাবে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য থেকে জামায়াতের আগামীর রাজনীতির তিনটি প্রধান দিক ফুটে উঠেছে। প্রথমত, দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়, বরং সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং নীতিবান অবস্থান থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় গঠনমূলক অবদান রাখা।
দ্বিতীয়ত, জুলাই বিপ্লবের চেতনা অনুযায়ী নাগরিকদের অধিকার রক্ষা এবং একটি ন্যায়বিচারপূর্ণ সমাজ গঠনে কাজ করা। তৃতীয়ত, সংসদে সরকারকে প্রতিটি কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা।
নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়া অগুনতি স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, অনেকে ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হওয়া সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তা দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে।
ডা. শফিকুর রহমানের এই ইতিবাচক মনোভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন সংস্কৃতির সূচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরাজিত হয়েও মাঠ না ছাড়া এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালনের এই ঘোষণা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখবে। এখন দেখার বিষয়, সংসদ অধিবেশনে ৭৭ জন সংসদ সদস্য নিয়ে জামায়াত কীভাবে শক্তিধর বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়।
জেএইচআর