ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসনে জয়লাভ করে সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ১৯৯১ সালের ১৮টি কিংবা ২০০১ সালের ১৭টি আসনের তুলনায় এটি দলটির জন্য একটি বিশাল উল্লম্ফন।
দীর্ঘ দেড় দশকের দমন-পীড়ন আর আইনি লড়াই শেষে এই প্রত্যাবর্তনকে দলটির সমর্থকরা বিজয় হিসেবে দেখলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ একে দেখছেন সুযোগ হারানো হিসেবে। গবেষকদের মতে, জামায়াত এই নির্বাচনে সংখ্যার বিচারে জিতলেও আদর্শিক গ্রহণযোগ্যতার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেখানে সবচেয়ে সুসংগঠিতভাবে মাঠে নেমেছিল জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন শিবির। অনেক কেন্দ্রেই তাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একধরনের উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল যে জামায়াত হয়তো এককভাবেই সরকার গঠন করবে। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল বলছে, সাধারণ ভোটাররা শেষ পর্যন্ত বিএনপিকেই তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে।
কেন জামায়াতের এই সুসংগঠিত প্রচার কাজ করল না তার পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ উঠে এসেছে। ৫ আগস্টের পর জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবী ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্টরা বাংলাদেশের ইতিহাসের বয়ান বদলে দেওয়ার একটি চেষ্টা শুরু করেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে ১৯৪৭ বা ২০২৪-এর গুরুত্বকে সামনে আনার প্রচেষ্টা সাধারণ ও মধ্যপন্থী ভোটারদের মনে একধরনের শঙ্কা তৈরি করে।
জাতীয় সংগীত পরিবর্তন এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার ফলে উদার ও ধর্ম নিরপেক্ষ ভোটাররা অস্তিত্বের সংকটে ভোগেন। নির্বাচনটি শেষ পর্যন্ত বিএনপি বনাম জামায়াত না হয়ে, সাংস্কৃতিক যুদ্ধ বনাম স্থিতিশীলতার লড়াইয়ে পরিণত হয়।
ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে জামায়াতের প্রচারণা ছিল আকাশচুম্বী। গ্রাফিক্স আর ভিডিওতে তারা অন্য সব দলকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এর একটি নেতিবাচক দিকও ছিল। অজ্ঞাতনামা আইডি থেকে প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ধর্মীয় তকমা দেওয়ার ফলে একটি স্বাভাবিক প্রতিরোধ তৈরি হয়। গবেষকরা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ঝড় সব সময় ভোটবাক্সে পৌঁছায় না। বিশেষ করে বয়স্ক ও গ্রামীণ ভোটাররা এখনো ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আস্থার ওপর ভিত্তি করে ভোট দেন, যা বিএনপির অনুকূলে ছিল।
নির্বাচনের আগে এবং উদীচী ও ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর যে ধরনের আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখা গেছে, তা জামায়াতের জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে। সাংবাদিক সমাজের সাথে তৈরি হওয়া এই ক্ষত নির্বাচনের আগে আর শুকায়নি।
গণমাধ্যমকে শত্রু হিসেবে গণ্য করার ফলে জামায়াত তাদের গঠনমূলক কর্মসূচি প্রচারের বড় একটি প্ল্যাটফর্ম হারিয়েছে। সংগঠন হিসেবে জামায়াত শক্তিশালী হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক রূপরেখা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের বার্তা ছিল অস্পষ্ট।
ব্যাংক খাত বা বেকারত্ব নিরসনে তাদের প্রস্তাবনাগুলো ধর্মীয় আবেগের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। মাঠ পর্যায়ে ভারত-বিরোধিতা করলেও ইশতেহারে সুসম্পর্কের কথা বলায় মধ্যপন্থী ভোটারদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়। এ ছাড়া নারী নেতৃত্ব ও নারীর সামাজিক ভূমিকা নিয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের কিছু পুরনো ও রক্ষণশীল মন্তব্য নারী ভোটারদের বড় একটি অংশকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
জামায়াত এখন সংসদে ৭৭টি আসন নিয়ে শক্তিশালী বিরোধী দল। কিন্তু এই সমর্থন কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। তারা যদি এই ফলাফলকে কেবল বিজয় মনে করে তাদের বর্তমান পথেই অনড় থাকে, তবে জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
অন্যদিকে তারা যদি এই ফলাফলকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নেয় এবং ইতিহাসের বয়ান, নারীর অবস্থান ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে, তবেই তারা ভবিষ্যতে প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে পারবে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের লড়াই ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রের আত্মা রক্ষার একটি গণভোট। ভোটাররা জানিয়ে দিয়েছেন তাঁরা কেবল সুসংগঠিত দল চান না, বরং এমন একটি ব্যবস্থা চান যা তাঁদের সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিগত পরিচয়কে ক্ষুণ্ণ করবে না। জামায়াত এখন বড় আসন নিয়ে সংসদে বসলেও, জনগণের পূর্ণ আস্থা অর্জনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া তাদের জন্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
জেএইচআর