জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গড়ছে এনসিপি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ১১:৩৩ এএম
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। ছবি: সংগৃহীত।

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন এবং আধুনিক ধারার সূচনা করতে যাচ্ছে নবগঠিত রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই এনসিপি ঘোষণা করেছে যে, তারা সংসদে কেবল গতানুগতিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে না, বরং সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতে একটি শক্তিশালী ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠন করবে।

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের ধারণাটি তাত্ত্বিকভাবে পরিচিত হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায়নি। তবে এবার সেই প্রথা ভাঙার ইঙ্গিত দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আজ রোববার সকালে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আসন্ন সংসদে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এনসিপি একটি পূর্ণাঙ্গ ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

রোববার সকাল ১০টা ১৬ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পোস্টে আসিফ মাহমুদ লিখেছেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ এই মন্ত্রিসভার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সার্বিক কার্যক্রমে ওয়াচডগ (Watchdog) হিসেবে কাজ করবে এই ছায়া মন্ত্রিসভা।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির এই উদ্যোগ মূলত নবনির্বাচিত সরকারকে একটি ইতিবাচক চাপের মধ্যে রাখা, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা বা অস্বচ্ছতা তৈরি না হয়।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, বিএনপি একাই ২০৯টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। মিত্রদের নিয়ে গঠিত তাদের জোটের মোট আসন সংখ্যা এখন ২১২। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ৭৭টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এই ১১-দলীয় জোটের অন্যতম অংশীদার হিসেবে এনসিপি ৬টি আসনে জয়লাভ করেছে। যদিও জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আসন পেয়েছে, তবুও এনসিপির এই ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের ঘোষণাটি বিরোধী শিবিরের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সংসদীয় গণতন্ত্রে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ হলো বিরোধী দলের একটি বিশেষ কাঠামো, যেখানে সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বিরোধী দলের একজন করে নির্দিষ্ট সদস্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সরকারের একজন মন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নেবেন, বিরোধী দলের ‘ছায়া মন্ত্রী’ সেই বিষয়ের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করবেন এবং ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেবেন।

কেবল সমালোচনা নয়, বরং জনস্বার্থে বিকল্প পলিসি বা নীতি কী হতে পারে, তা এই মন্ত্রিসভা উপস্থাপন করবে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারের কার্যক্রমের ওপর একটি অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করবে এই কাঠামো।

নির্বাচন কমিশনের গেজেট অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন। একই দিন বিকেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ঠিক এই মাহেন্দ্রক্ষণেই এনসিপি তাদের পরিকল্পনা জানান দিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করল।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের অভাব অনুভূত হচ্ছিল। বিশেষ করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে যখন বিএনপি ক্ষমতায় বসছে, তখন বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনসিপি প্রধানত তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে এবং তারা জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে। তাদের এই ‘ওয়াচডগ’ ভূমিকা পালনের ঘোষণাটি দেশের সুশীল সমাজ ও সাধারণ ভোটাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।

তবে প্রশ্ন উঠছে, ১১-দলীয় জোটের বড় অংশীদার জামায়াতে ইসলামীর সাথে এনসিপির এই ছায়া মন্ত্রিসভার সমন্বয় কেমন হবে? নাকি এনসিপি স্বতন্ত্রভাবে নিজেদের সদস্যদের মধ্য থেকেই এই কাঠামো গড়ে তুলবে—তা নিয়ে এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি।

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে ছায়া মন্ত্রিসভার এই মডেল যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কারে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। আসিফ মাহমুদের এই ঘোষণা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা—সংসদে কেবল হাত তোলাই নয়, বরং যুক্তিনির্ভর বিতর্কের মুখোমুখি হতে হবে তাদের।

এএন