বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল এবং তাৎপর্যপূর্ণ সৌজন্যের নজির স্থাপন করতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রতিহিংসা ও বিভাজনের রাজনীতির প্রথা ভেঙে তিনি সংলাপ ও সম্প্রীতির এক নতুন বাতাবরণ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। তার এই ইতিবাচক পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।
নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রতিহিংসার পুরোনো ছক ভেঙে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির উদয় হতে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই জোটের শরিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর এই উদ্যোগকে ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ইতিবাচক রাজনীতির সূচনা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এনসিপি নেতা সারজিস আলম।
রোববার দুপুর ১২টা ১৭ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টের মাধ্যমে সারজিস আলম তারেক রহমানের এই সৌজন্য সফরের প্রশংসা করেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য এই মুহূর্তে রাজনীতিবিদদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতির নতুন ধারা অত্যন্ত জরুরি।
সারজিস আলম তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘ইতিবাচক রাজনীতির সূচনা হিসেবে বিএনপির চেয়ারপারসন জনাব তারেক রহমান আজ সন্ধ্যায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং এনসিপি'র আহ্বায়ক জনাব নাহিদ ইসলামের বাসায় যাচ্ছেন। পুরনো প্রতিহিংসার রাজনৈতিক কালচার বাদ দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার রাজনৈতিক দল এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতির নতুন ধারা। জনাব তারেক রহমান সেই উদ্যোগ গ্রহণ করায় আন্তরিক ধন্যবাদ।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ সন্ধ্যা ৭টায় তারেক রহমান মগবাজারে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের বাসভবনে যাবেন। এরপর রাত ৮টায় তিনি এনসিপি'র আহ্বায়ক ও সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাতে যাবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের আগেই দেশের বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রধানদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করে তারেক রহমান একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে চাচ্ছেন। সেটি হলো—আগামীর বাংলাদেশ হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরমতসহিষ্ণু। যেখানে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কেবল বৈরিতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থে আলোচনার পথও খোলা থাকবে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে, ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথেই বিজয়ী দল প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করে। কিন্তু তারেক রহমানের এই সৌজন্য সফর সেই প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে যে ‘পরিবর্তনের রাজনীতি’র কথা তরুণ প্রজন্ম বলে আসছিল, তারেক রহমানের এই পদক্ষেপ তাকেই বাস্তব রূপ দিচ্ছে বলে মনে করেন সারজিস আলম।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পেয়ে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পেয়েছে। আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই জামায়াত আমির ও এনসিপি আহ্বায়কের সাথে তাঁর এই বৈঠক কেবল সৌজন্যমূলক নয়, বরং আগামীর রাষ্ট্র সংস্কার এবং সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধী দলগুলোর সহযোগিতা পাওয়ার এক কৌশলী প্রয়াস হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী (৬৮ আসন) এবং এনসিপি (৬ আসন) আসন্ন সংসদে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ হিসেবে থাকছে। তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা সরকারের জন্য নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বিশেষ সুবিধাজনক হতে পারে।
সারজিস আলমের ফেসবুক পোস্ট এবং তারেক রহমানের এই সৌজন্য সফর দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার করেছে। এটি প্রমাণ করছে যে, ক্ষমতার পটপরিবর্তন কেবল মুখের কথা নয়, বরং আচরণের মাধ্যমেও সম্ভব। যদি রাজনৈতিক দলগুলো এই পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি ধরে রাখতে পারে, তবেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ টেকসই হবে।
এএন