সংসদে ছক কষছে জামায়াত: ‘নতুন’ এমপিদের সংসদীয় পাঠ দিতে বিশেষ কর্মশালা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়ার পর এবার সংসদীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে কোমর বেঁধে নেমেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। 

মঙ্গলবার শপথ গ্রহণ শেষ হতেই সংসদে দায়িত্বশীল ও সৃজনশীল বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের লক্ষ্যে দলীয় সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ বা পরিচিতি কর্মসূচির আয়োজন করেছে দলটি। মূলত বিল, বাজেট এবং সংসদীয় কার্যপ্রণালী সম্পর্কে প্রথমবার নির্বাচিত সদস্যদের ঝালিয়ে নিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সংলগ্ন আল ফালাহ মিলনায়তনে গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুই দিনব্যাপী এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের সংসদে জামায়াতের নির্বাচিত সদস্যদের প্রায় ৮০ শতাংশই তরুণ এবং প্রথমবার সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন।

সংসদীয় রীতিনীতি, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং প্রোটোকল সম্পর্কে তাঁদের নবিশ দশা কাটাতে অভিজ্ঞ সাবেক আমলা, শিক্ষাবিদ এবং সাবেক সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে এই পরিচিতি কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়।

মোট পাঁচটি সেশনে বিভক্ত এই কর্মশালায় সংসদ সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বেশ কিছু তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সংসদীয় কার্যপ্রণালী তথা বিল উত্থাপন, বাজেট আলোচনা এবং স্থায়ী কমিটিগুলোতে কার্যকর ভূমিকা রাখার কৌশল উল্লেখযোগ্য। 

এছাড়া একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত আচরণবিধি, সংসদীয় শিষ্টাচার এবং বিরোধী দল হিসেবে জনস্বার্থবিরোধী কোনো বিলের ক্ষেত্রে কৌশলগত অবস্থান ও সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার নিয়ম শেখানো হয়। প্রস্তাবিত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা চালু হলে নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ বা সিনেটের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও সম্পর্ক কেমন হবে, সে বিষয়েও সদস্যদের আগাম ধারণা দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের এই উদ্যোগের লক্ষ্য সম্পর্কে দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, তাঁরা সংসদে কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়, বরং একটি গ্রহণযোগ্য ভূমিকা পালন করতে চান। 

তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ সদস্যদের যে বিষয়গুলো জানা জরুরি, সে বিষয়ে একটি প্রাথমিক ধারণা দিতেই এই আয়োজন। আমরা চাই আমাদের সদস্যরা সংসদে যুক্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক আলোচনা করুক। তিনি আরও জানান, বাজেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সদস্যদের দক্ষতা বাড়াতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কর্মশালা অব্যাহত থাকবে।

কর্মশালায় অংশ নেওয়া নতুন সংসদ সদস্যরা এই উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ঢাকা ১২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন জানান, প্রথমবার সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর অনেক কিছুই অজানা ছিল, যা এই কর্মশালার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। একই সুরে কথা বলেন ঢাকা ১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। 

তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের সিংহভাগই নতুন, তাই সংসদের ভেতরে কীভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়, তা শিখতে এই পরিচিতি পর্ব অত্যন্ত সহায়ক হয়েছে। পাবনা ১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেনও মনে করেন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ তাঁদের সংসদীয় বিতর্ক ও বিল পর্যালোচনায় আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী এবার সংসদে কেবল সংখ্যাগত উপস্থিতি নয়, বরং গুণগত উপস্থিতির ওপর জোর দিচ্ছে। সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে তাঁরা প্রমাণ করতে চান যে, রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি সংসদীয় বিতর্কেও তাঁরা সমভাবে পারদর্শী। বিশেষ করে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ নিয়ে সদস্যদের আগাম পাঠ দেওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, দলটি আগামী দিনের শাসনতান্ত্রিক সংস্কারে বড় ধরনের ভূমিকা রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। 

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তা নির্ভর করবে তাঁদের সংসদীয় পারফরম্যান্সের ওপর। মগবাজারের এই দুই দিনের চিন্তাশীল সেশন সদস্যদের কতখানি দক্ষ করে তুলেছে, তার প্রমাণ মিলবে আসন্ন বাজেট অধিবেশনে।

জেএইচআর