সংরক্ষিত নারী আসন ঘিরে দলগুলোতে তৎপরতা, কারা পাচ্ছেন মনোনয়ন

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সংরক্ষিত নারী আসনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় দলটির ভেতরে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা এখন চোখে পড়ার মতো। দলীয় সূত্র বলছে, চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই সংরক্ষিত ৫০ নারী আসনের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি সাধারণ আসনে জয় পেয়েছে। আসন অনুপাতে সংরক্ষিত ৫০ নারী আসনের মধ্যে দলটি পাবে ৩৫টি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাবে ১১টি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাবে ১টি। বাকি ৩টি আসন স্বতন্ত্র ও ছোট দলগুলোর মধ্যে বণ্টিত হবে।

বিএনপির ভেতরে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। মহিলা দল, ছাত্রদল এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেত্রীরা নিজেদের প্রোফাইল তৈরি করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পাঠাচ্ছেন। দলীয় আনুগত্য, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও পেশাগত যোগ্যতা তুলে ধরে অনেকে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ আবার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন।

তবে দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো সংরক্ষিত নারী আসনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, ঈদের আগে সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এবারের সংরক্ষিত নারী আসনে নবীন ও প্রবীণ নেত্রীদের সমন্বয় দেখা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত প্রবীণদের পাশাপাশি তরুণ নেতৃত্বেরও বড় একটি অংশ সুযোগ পেতে পারে।

আলোচনায় থাকা প্রবীণদের মধ্যে আছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শিরিন সুলতানা, রেহানা আক্তার (রানু), নিপুণ রায় চৌধুরী, সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীন, নিলুফার চৌধুরী (মনি), বিলকিস ইসলাম, শাম্মী আখতার, সৈয়দা আসিফা আশরাফী (পাপিয়া), রাশেদা বেগম (হীরা), রোখসানা খানম, আয়েশা সিদ্দিকা, নেওয়াজ হালিমা, ফরিদা ইয়াসমীন, হেলেন জেরিন, আইনজীবী শাকিলা ফারজানা, প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন, মনোয়ারা বেগম (মনি) ও রুমা আক্তার।

বেবী নাজনীন বলেন, তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে দৌড়ঝাঁপ করছেন না; তবে যোগ্যদের নাম অবশ্যই বিবেচনায় আসা উচিত।

এবার সাবেক ছাত্রদল নেত্রীদেরও তৎপরতা বেশি। মহিলা দলের সহ-স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক আসমা আজিজ, সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সুলতানা জেসমিন (জুঁই), ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব নাসিমা আক্তার (কেয়া), শিক্ষক রোকেয়া চৌধুরী, সুরাইয়া বেগমসহ অনেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী।

সুলতানা জেসমিনের মতে, রাজনীতিতে মাঠের সংগ্রামের পাশাপাশি একাডেমিক যোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হওয়া উচিত।

জামায়াতে ইসলামী ও সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটির মহিলা বিভাগ থেকে একটি খসড়া তালিকা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

দলের নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের জানিয়েছেন, সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন—এমন উপযুক্ত নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাছুম বলেছেন, প্রথম অধিবেশনের আগেই মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে।

আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য নামের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, আইনজীবী সাবিকুন্নাহার, মার্জিয়া বেগম ও মারদিয়া মমতাজ। দলীয় সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের মধ্য থেকেও মনোনয়ন আসতে পারে। এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একজন নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

জামায়াতে ইসলামী এর আগে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদে দুটি এবং ২০০১ সালের অষ্টম সংসদে চারটি সংরক্ষিত নারী আসন পেয়েছিল। এবার ত্রয়োদশ সংসদে দলটি সর্বোচ্চ ১১টি আসন পেতে যাচ্ছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একটি সংরক্ষিত নারী আসন পাবে। আলোচনায় আছেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মাহমুদা আলম (মিতু)।

জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের সরকারি গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই, প্রত্যাহার ও ভোটের তারিখ নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

এবার নির্বাচনের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে ১৩ ফেব্রুয়ারি। সংবিধান অনুযায়ী, ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন ডাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসাবে ১৪ মার্চের মধ্যে অধিবেশন বসতে হবে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি সাধারণ আসনে ৮৬ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁদের মধ্যে জয়ী হয়েছেন মাত্র ৭ জন এর মধ্যে ৬ জন বিএনপির এবং ১ জন স্বতন্ত্র। সংরক্ষিত ৫০ আসন যুক্ত হলে সংসদে নারী সদস্যের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৭ জন, যা ৩৫০ সদস্যের সংসদে প্রায় ১৬ শতাংশ।

নিপুণ রায় চৌধুরীর মতে, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী হওয়া সত্ত্বেও সরাসরি নির্বাচনে অনেক যোগ্য নারী অংশ নিতে পারেননি। তাই সংরক্ষিত নারী আসনের মাধ্যমে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনে ভূমিকা বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হবে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের কয়েক দিন পার হলেও এখনো সংসদের প্রথম অধিবেশন ডাকা হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন ও নির্বাচনপ্রক্রিয়া শেষ হলে সংসদে নারীর অংশগ্রহণের নতুন এক চিত্র ফুটে উঠবে।

সব মিলিয়ে, সংরক্ষিত ৫০ নারী আসনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোতে চলছে নীরব প্রতিযোগিতা। নবীন-প্রবীণ, আন্দোলন-সংগ্রাম ও পেশাগত যোগ্যতার সমন্বয়ে কারা শেষ পর্যন্ত সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন—সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই।

এএন