নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে মির্জা আব্বাসের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ৮, ২০২৬, ১১:১৩ এএম

বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে নির্বাচন-পরবর্তী উত্তাপ যেন কমছেই না। বিশেষ করে ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাসকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আপত্তিকর’ ও ‘মানহানিকর’ মন্তব্য করার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে।

রোববার সকালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসান শাহাদাতের আদালতে এই মামলার আবেদন জমা দেওয়া হয়। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ শেষে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে অভিযুক্ত নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন।

মামলাটি দায়ের করেছেন রমনা থানা বিএনপির সভাপতি আশরাফুল ইসলাম। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে আসছেন।

অভিযুক্ত ব্যক্তি বিভিন্ন সময় মির্জা আব্বাসকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন পোর্টালে মির্জা আব্বাসের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ে অসত্য তথ্য ছড়িয়েছেন।

গত ৫ মার্চ বেশ কিছু অনলাইন সংবাদমাধ্যমে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর কিছু উদ্ধৃতি প্রকাশিত হয়, যা অত্যন্ত আপত্তিকর এবং মির্জা আব্বাসের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ওপর কালিমা লেপনের চেষ্টা বলে দাবি করেছেন বাদীপক্ষ।

বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. আমিরুল ইসলাম আমির সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘গণতন্ত্রে হার-জিত থাকবেই, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ বা মানহানিকর বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমার মক্কেল মনে করেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর এই কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র মির্জা আব্বাসের মানহানি করেনি, বরং রাজনৈতিক শিষ্টাচারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।’

এই আইনি লড়াইয়ের মূলে রয়েছে অতি সম্প্রতি শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ঢাকা-৮ আসনটি এবার ছিল সারা দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, লড়াইটি ছিল অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি। মাত্র ৫,২৩৯ ভোটের ব্যবধানে মির্জা আব্বাস জয়ী হন। হারের পর থেকেই নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিভিন্ন জনসভায় এবং ফেসবুকে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিজয়ী প্রার্থীর ভূমিকা নিয়ে কড়া সমালোচনা শুরু করেন।

উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মির্জা আব্বাস ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর এক সংক্ষিপ্ত কথোপকথন বেশ ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে মির্জা আব্বাসকে স্নেহভরে বা সতর্কবাণী হিসেবে বলতে শোনা যায় "দুষ্টুমি করবা না"। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা আব্বাসের সেই মন্তব্যটি ছিল একজন সিনিয়র রাজনীতিকের পক্ষ থেকে জুনিয়রকে দেওয়া একটি 'পরামর্শ' বা 'সতর্কবার্তা'।

তবে এর পরবর্তী কয়েক দিনে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এবং পূর্ববর্তী পরাজয়ের ক্ষোভ থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক প্রচারণা শুরু করেন।

আজ আদালতে শুনানির সময় ম্যাজিস্ট্রেট বাদীর জবানবন্দি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী, মানহানি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় আদালত অভিযুক্তকে সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, এই মামলাটি দেশের নবীন ও প্রবীণ রাজনীতিকদের মধ্যে এক ধরণের স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিফলন। একদিকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস, যিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন; অন্যদিকে রাজপথের নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত এনসিপির তরুণ তুর্কী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

মির্জা আব্বাসের পক্ষ থেকে দায়ের করা এই মামলাটি কেবল একটি আইনি লড়াই নয়, বরং এটি রাজনৈতিক সম্মানের লড়াই হিসেবেও দেখা হচ্ছে। মামলার বাদী আশরাফুল ইসলাম জানান, তারা আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আদালতের মাধ্যমেই এই অপপ্রচারের বিচার চান। অন্যদিকে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এএন