ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সেই ‘অধিকার’ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে, সরকার পক্ষ অর্থাৎ বিএনপি তাদের সিদ্ধান্তে অটল থেকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।
বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে বিরোধী দলীয় সংসদীয় কমিটির বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া একটি আবশ্যিক প্রক্রিয়া। তবে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান গত জুলাই বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী এবং তিনি ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে কাজ করেছেন। কুমিল্লা-১১ আসনের সংসদ সদস্য ডা. তাহের স্পষ্টভাবে বলেন, ‘বর্তমান রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ দেওয়ার কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক অধিকার নেই।’
জামায়াতের এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদে ভাষণ দেবেন এবং সরকার এই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর।
সংসদীয় রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির লক্ষে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে ‘ডেপুটি স্পিকার’ পদের জন্য একটি মৌখিক প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে জামায়াত সেই প্রস্তাবটি আপাতত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক ব্রিফিংয়ে জানান, ক্ষমতার অংশীদার হওয়া তাদের এই মুহূর্তের লক্ষ্য নয়। বরং সংসদে আগে ‘জুলাই সনদ’ (২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অঙ্গীকারনামা) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এই সনদের বাস্তবায়ন ও এর ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা স্পষ্ট হওয়ার পরই কেবল তারা ডেপুটি স্পিকার পদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত ও বিএনপির এই বিপরীতমুখী অবস্থান ত্রয়োদশ সংসদের শুরুতেই এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিএনপি যেখানে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে দ্রুত স্থিতিশীলতা আনতে চায়, সেখানে জামায়াত চাচ্ছে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে শতভাগ ধারণ করে শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার অধিবেশন শুরু হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় জামায়াতের সংসদ সদস্যরা কী ভূমিকা পালন করেন এবং সরকার কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এই দুটি ইস্যুতেই সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে। এই বিতর্ক কি কেবল প্রথম অধিবেশনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক বিরোধের জন্ম দেবে, তার উত্তর মিলবে আগামীকালের সংসদীয় কার্যক্রমে।
এএন