জুলাই সনদের দাবিতে রাজপথে ১১ দলের কর্মসূচি ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ০২:৫৭ পিএম

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের দাবিতে আন্দোলনের নতুন ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১টি রাজনৈতিক দলের জোট। 

বৃহস্পতিবার রাজধানীর মগবাজারস্থ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। 

জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এই কর্মসূচি ঘোষণা করে বর্তমান সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শাসনব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন না হলে দেশ আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, প্রথম দফায় ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী রাজপথে থাকবে ১১ দলের নেতাকর্মীরা। আন্দোলনের এই ধাপটিকে ‘গণজাগরণ ও জনসংযোগ সপ্তাহ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। 

কর্মসূচির বিস্তারিত সূচি নিম্নরূপ:

১৮ এপ্রিল রাজধানী ঢাকায় ১১ দলের বিশাল ‘গণমিছিল’। এই মিছিলের মাধ্যমে সরকারের ওপর সংস্কারের চাপ সৃষ্টি করা হবে। ২৫ এপ্রিল ঢাকা ব্যতীত দেশের সকল বিভাগীয় শহরে একযোগে গণমিছিল অনুষ্ঠিত হবে। ২ মে সারাদেশের প্রতিটি জেলায় জেলায় গণমিছিলের কর্মসূচি পালিত হবে। ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে প্রতিটি বিভাগীয় ও গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরগুলোতে লিফলেট বিতরণ এবং ‘জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কার’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এসব সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করবেন। পরবর্তী ধাপে প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও বিভাগীয় পর্যায়ে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে, যার চূড়ান্ত রূপ হিসেবে রাজধানী ঢাকায় একটি ‘বিশাল মহাসমাবেশ’ আয়োজন করা হবে বলে জানান জোটের নেতৃবৃন্দ।

সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশে জ্বালানির তীব্র হাহাকার চলছে, অথচ সরকার নির্লজ্জ মিথ্যাচার করছে। সংসদে দাঁড়িয়ে মন্ত্রীরা যখন বলছেন জ্বালানি সংকট নেই, ঠিক তখনই দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে গাড়ির মাইলের পর মাইল লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছে না। এমনকি জাতীয় সংসদের সদস্যরাও নিজেরা তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, অথচ সরকার বলছে সব ঠিক আছে। এই ধরণের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য জনগণের সঙ্গে উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।

তিনি আরও যোগ করেন, জ্বালানি সংকটের কারণে শহরের পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, যার প্রভাব সরাসরি নিত্যপণ্যের বাজারের ওপর পড়ছে। সরকার এই বাস্তবতাকে আড়াল করে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে।

বর্তমান প্রশাসনের রদবদল এবং প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি অভিযোগ করেন, এক দেড় মাসের মধ্যে প্রশাসনে যে ধরণের বদলি, ওএসডি এবং কর্মকর্তাদের পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা ঘটছে, তা কেবল একটি ফ্যাসিবাদী স্টাইলেই সম্ভব।

তিনি বলেন, যাঁরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বড় বড় কথা বলে ক্ষমতায় এলেন, আমরা দেখছি তাঁরা নিজেরাই সেই একই পথে হাঁটছেন। সচিবালয় থেকে শুরু করে একেবারে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত কর্মকর্তাদের সরিয়ে সেখানে দলীয় লোক বসানো হচ্ছে। এই নির্লজ্জ দলীয়করণের ফলে রাষ্ট্র ব্যবস্থার কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি। এটি আসলে ফ্যাসিবাদের নতুন সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

১১ দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর যে ‘জুলাই সনদ’ তৈরি হয়েছিল, সেখানে রাষ্ট্র সংস্কারের যে মৌলিক বিষয়গুলোতে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তা বাস্তবায়নেই সরকারের অনীহা দেখা যাচ্ছে। জোটের দাবি, কেবল নির্বাচন বা ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এ লক্ষে জনগণের সম্মতি যাচাই করতে একটি ‘গণভোট’ আয়োজনের দাবিও পুনরুল্লেখ করেন নেতৃবৃন্দ।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের উর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ ছাড়াও ১১ দলের শীর্ষ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে এই জোটবদ্ধ কর্মসূচি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে প্রশাসনের দলীয়করণ এবং জ্বালানি সংকটের মতো জনসম্পৃক্ত ইস্যুগুলোকে সামনে এনে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের এই চেষ্টা সরকারের জন্য বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আগামী ১৮ এপ্রিলের গণমিছিল থেকেই বোঝা যাবে, এই জোটের আন্দোলন সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়।

এম জি