বাংলাদেশের অরাজনৈতিক ঘরানার সবচেয়ে বড় ইসলামী প্লাটফর্ম হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এক কঠিন সময় পার করছে। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এই সংগঠনটির ভেতরে এখনকার সবচেয়ে আলোচিত ও উত্তপ্ত বিষয় হলো- জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া নেতাদের ভবিষ্যৎ।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেফাজতের শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতার রাজনৈতিক দল জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে অংশ নেওয়ায় সংগঠনটির ভেতরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
হেফাজত আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী সরাসরি এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছেন এবং জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার কারণ দর্শাতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামপন্থি ঘরানায় শুরু হয়েছে নতুন গুঞ্জন- তবে কি বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়তে যাচ্ছে হেফাজতে ইসলাম?
প্রেক্ষাপট: শাপলা চত্বর থেকে সংসদ নির্বাচন
২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে তৎকালীন আওয়ামী শাসনামলের বিরুদ্ধে যে গণজাগরণ হেফাজত সৃষ্টি করেছিল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। সেই থেকে শাসকগোষ্ঠীর রোষানল, মামলা আর কারাবরণ ছিল হেফাজত নেতাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হেফাজতের অরাজনৈতিক চরিত্রে ফাটল ধরতে শুরু করে।
সংগঠনটির উপদেষ্টা, নায়েবে আমির এবং যুগ্ম মহাসচিব পর্যায়ের অনেক নেতার নিজস্ব রাজনৈতিক দল রয়েছে।
নির্বাচনের সময় দেখা যায়, হেফাজতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের নেতৃত্বাধীন অন্তত পাঁচটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত ভিন্ন ভিন্ন জোটে অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে চারটি দল সরাসরি জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা বা নির্বাচনী ঐক্যে জড়ায়, যা হেফাজতের কট্টরপন্থি ও কওমি আদর্শবাদী নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
আমিরের কঠোর অবস্থান ও সাত সদস্যের কমিটি
জামায়াতে ইসলামীর সাথে আদর্শিক ও নীতিগত কারণে কওমি আলেমদের একটি দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে হেফাজত নেতারা জামায়াতের জোটে শামিল হওয়াকে সংগঠনের মূল নীতির পরিপন্থী বলে মনে করছেন আমিরে হেফাজত মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী।
গত ১৮ এপ্রিল আমিরের বাসভবনে এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় যে, জামায়াত জোটে যাওয়া চারটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে কথা বলতে সাত সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি কাজ করবে। এই কমিটি মূলত অনুসন্ধান করবে যে, কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে তাঁরা জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হলেন। কমিটির পর্যালোচনার ভিত্তিতেই পরবর্তী কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে, যা এমনকি সংশ্লিষ্ট নেতাদের পদচ্যুতির কারণও হতে পারে।
নেতাদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও মামুনুল হকের বক্তব্য
হেফাজতের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক এই পুরো বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি মনে করেন, এটি মূলত একটি মতবিনিময় প্রক্রিয়া। মামুনুল হক বলেন, আমরা যারা ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে ছিলাম, আমরা কী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ছিলাম তা আমিরের কাছে ব্যাখ্যা করব। তবে বাইরের একটি পক্ষ চেষ্টা করছে হেফাজতের ভেতরে বিভেদ সৃষ্টি করে এর কার্যকারিতা নষ্ট করতে।
অন্যদিকে, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ কিছুটা ভিন্ন সুর তুলেছেন। তাঁর মতে, হেফাজত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন এবং কোনো রাজনৈতিক দলের জোট গঠন বা কৌশল নিয়ে হেফাজতের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। তিনি কিছুটা আক্ষেপের সুরে বলেন যে, বয়োবৃদ্ধ আমিরকে হয়তো কেউ ভুল বুঝিয়ে এমন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
জামায়াত-হেফাজত দূরত্ব: বিশ্বাস ও নীতির লড়াই
হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশীরুল্লাহর বক্তব্যে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। তিনি সরাসরি স্বীকার করেছেন যে, জামায়াতের সঙ্গে হেফাজতের বা কওমি ধারার আলেমদের 'বিশ্বাসগত এবং নীতিগত মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। এই দূরত্বের কারণেই মূলত জামায়াত সংশ্লিষ্টতা হেফাজতের ভেতরে নেতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।
হেফাজতের সাধারণ কর্মীদের একটি বড় অংশ মনে করে, জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হলে হেফাজত তার স্বতন্ত্র জৌলুস হারাবে এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়বে। আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী চাচ্ছেন হেফাজতকে পুরোপুরি 'কওমি স্বাতন্ত্র্য' এবং 'অরাজনৈতিক' কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে নিতে।
ভাঙন নাকি সংস্কার?
সোশ্যাল মিডিয়া এবং রাজনৈতিক মহলে হেফাজতের সম্ভাব্য ভাঙন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চললেও সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী একে 'বিভ্রান্তি' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিগত নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো কৌশলগত কারণে বিভিন্ন অ্যালায়েন্স করেছে। কিন্তু হেফাজতের মঞ্চে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। যারা হেফাজতের শক্তিকে ভয় পায়, তারাই ভাঙনের গুজব ছড়াচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি এতোটা সহজ নয়। যদি সাত সদস্যের কমিটি তাদের রিপোর্টে জামায়াত জোটে যাওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো সুপারিশ করে, তবে হেফাজতের বড় একটি অংশ মূল সংগঠন থেকে ছিটকে পড়তে পারে। যা ইসলামপন্থি এই বৃহত্তর প্লাটফর্মের শক্তিক্ষয় ঘটাবে।
অরাজনৈতিক তকমার আড়ালে রাজনীতির ছায়া
২০১০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে হেফাজতে ইসলাম সবসময় দাবি করে আসছে তারা অরাজনৈতিক। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের প্রভাব অপরিসীম। বিশেষ করে সংসদ নির্বাচন এবং দেশের বড় কোনো সংকটে হেফাজতের অবস্থান নির্ধারণ করে দেয় জনমতের একটি বড় অংশ। ২০২৬ সালের এই সংকটের মূলে রয়েছে—হেফাজত কি কেবল একটি ধর্মীয় প্রেসার গ্রুপ হিসেবে থাকবে, নাকি এর নেতারা রাজনৈতিকভাবে জামায়াত বা বিএনপির ছত্রছায়ায় নিজেদের অবস্থান পোক্ত করবেন?
হেফাজতে ইসলামের বর্তমান অভ্যন্তরীণ টানাটানি কেবল জামায়াত বিরোধিতা নয়, বরং এটি সংগঠনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং আদর্শিক বিশুদ্ধতা রক্ষার লড়াই। আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী যদি সফলভাবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা দূর করতে পারেন, তবে হেফাজত হয়তো তার হারানো জৌলুস ফিরে পাবে। কিন্তু যদি নেতাদের ইগো এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বড় হয়ে দাঁড়ায়, তবে ২০২৬ সাল হতে পারে হেফাজত ভাঙনের বছর।
আপাতত সবার চোখ সাত সদস্যের কমিটির রিপোর্টের দিকে। এই রিপোর্টই নির্ধারণ করে দেবে কওমি জনগোষ্ঠীর এই বিশাল সংগঠনটি ঐক্যবদ্ধ থাকবে নাকি বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়বে।
এএন