কোরআনুল কারিমের প্রথম সূরা হলো সূরা আল-ফাতিহা। এর প্রথম শব্দ ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’ থেকে একে অনেকে সংক্ষেপে ‘সূরা আলহামদ’ বলে থাকেন। ‘ফাতিহা’ শব্দের অর্থ: ‘উদ্বোধন’ বা ‘সূচনা’।
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা এই সূরাটির মাধ্যমে সমগ্র কোরআনের দ্বার খুলে দিয়েছেন। এটি যেন এক চাবি, যার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর রহমত ও হেদায়েতের দরজা খুলতে পারে। সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ, এটিতে মোট ৭টি আয়াত আছে।
সূরা আল-ফাতিহাকে বলা হয়: “উম্মুল কিতাব” (গ্রন্থের জননী), “আস-সাব’উল মসানি” (সাতটি পুনরাবৃত্ত আয়াত)। কারণ, এই সূরাটি প্রতিটি নামাজের প্রতিটি রাকআতে পাঠ করাতে হয়, এবং মুসলমানরা প্রতিদিন অসংখ্যবার এই সূরাটি পরেন।
সূরা আল-ফাতিহার অনুবাদ ও সারমর্ম:
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
‘পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।’
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের পালনকর্তা।’
الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
‘যিনি পরম করুণাময়, অতিশয় দয়ালু।’
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
‘যিনি বিচার দিবসের একমাত্র অধিপতি।’
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
‘আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি এবং শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।’
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
‘আমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করো।’
صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
‘তাদের পথে পরিচালিত করো, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ, তাদের পথে নয়, যাদের প্রতি রোষানল নিক্ষিপ্ত হয়েছে কিংবা যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।’
‘আলহামদুলিল্লাহ’ একটি আয়াতে অসীম জ্ঞান
‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’, এই আয়াতটি শুধু প্রশংসা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসের ঘোষণা।
এখানে তিনটি মহান বিষয় নিহিত আছে:
১. কৃতজ্ঞতা ও বিনয়: মানুষ যা কিছু পেয়েছেন জীবন, জ্ঞান, বুদ্ধি, রিজিক সবই আল্লাহর দান। তাই সব প্রশংসা তাঁরই জন্য।
২. ঐক্য ও সার্বজনীনতা: “রাব্বুল আলামিন” অর্থাৎ “সমস্ত জগতের প্রতিপালক” কেবল মুসলমানদের নয়, বরং সব সৃষ্টির, সব জাতির, এমনকি অবিশ্বাসীরও রব আল্লাহই।
৩. মানবিক বার্তা: এটি মানুষকে শেখায়, অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা ও নম্রতা হোক জীবনের মূলনীতি।
কেন সূরা আল-ফাতিহা কোরআনের প্রথম সূরা করা হয়েছে
১️. কোরআনের মূল দর্শন এর মধ্যেই নিহিত: সূরা আল-ফাতিহা হচ্ছে কোরআনের সারসংক্ষেপ। যেমন: আল্লাহর একত্ব (তাওহিদ): “রাব্বুল আলামিন”। রহমত ও করুণা: “আর-রাহমানির রাহিম”। পরকাল ও বিচার: “মালিকি ইয়াওমিদ্দিন”। ইবাদত ও সাহায্য: “ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাইন”। হেদায়েতের দোয়া: “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম”। অর্থাৎ, কোরআনের সমস্ত শিক্ষার মূল বক্তব্য এই এক সূরাতেই সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
২️. মানবজীবনের নির্দেশিকা: এই সূরাটি আমাদের শেখায় জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে হবে, অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা ও হেদায়েত চাওয়া জীবনের পথ।
৩️. নামাজের ভিত্তি: প্রতিটি নামাজে সূরা আল-ফাতিহা পাঠ আবশ্যক করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি সূরা আল-ফাতিহা না পড়ে নামাজ পড়ে, তার নামাজ সম্পূর্ণ নয়। (সহিহ বুখারি)
এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ এই সূরাকে বান্দা ও রবের মধ্যকার সরাসরি সংলাপের মাধ্যম বানিয়েছেন।
৪️. আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি: সূরা আল-ফাতিহা শুরু হয় প্রশংসা দিয়ে, মাঝখানে ইবাদতের ঘোষণা, শেষে দোয়া দিয়ে। অর্থাৎ, বান্দা প্রথমে প্রভুর প্রশংসা করে, তারপর তার আনুগত্য জানায়, এবং শেষে তাঁর কাছ থেকে দিকনির্দেশনা চায়। এই ক্রমবিন্যাসই ইসলামের আধ্যাত্মিক কাঠামো।
সূরা আল-ফাতিহার আধ্যাত্মিক প্রভাব:
ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেছেন: যে ব্যক্তি সূরা আল-ফাতিহার অর্থ গভীরভাবে অনুধাবন করবে, তার মধ্যে অহংকারের কোনো স্থান থাকবে না।
কোরআনের হৃদয় বলা হয় কেন
অনেক আলেম বলেছেন, সূরা আল-ফাতিহা হলো “হৃদয়” (Heart of the Qur’an) কারণ এতে ঈমান, ইবাদত, দোয়া, হেদায়েত ও পরকালের সব মূল বিষয় একত্রে এসেছে। যেমন: হৃদয় দেহে প্রাণ দেয়, তেমনি এই সূরা কোরআনের প্রতিটি শিক্ষা ও আখলাককে প্রাণ দেয়।
মানুষের জীবনে সূরা আল-ফাতিহার শিক্ষা
সূরা আল-ফাতিহা কেবল একটি ছোট সূরা নয়, এটি পুরো কোরআনের সারাংশ, ঈমানের প্রাণ এবং মানব জীবনের দিকনির্দেশক আলোকবর্তিকা। যে ব্যক্তি এর অর্থ ও মর্ম উপলব্ধি করে পাঠ করে, তার অন্তরে সৃষ্টি হয় তাওহিদের আলো, রহমতের আশা এবং হেদায়েতের পথচলা।
‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা মানে শুধু প্রশংসা নয়, এটি জীবনের প্রতিটি নিশ্বাসে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার অঙ্গীকার।
এই কারণেই আল্লাহ তা’আলা কোরআনের প্রথম সূরাই করেছেন সূরা আল-ফাতিহা, যাতে প্রতিটি মুমিন বান্দা কোরআন পাঠ শুরু করার আগে প্রথমেই মনে রাখে: সব প্রশংসা, সব কৃতজ্ঞতা, সব ক্ষমতা, কেবল আল্লাহরই।
সূরা আল-ফাতিহা তাই শুধু কোরআনের প্রথম সূরা নয়, এটি কোরআনের দরজা, ইসলামের হৃদয়, এবং মুমিনের আত্মার আলো।
জেএইচআর