মানুষের এই পৃথিবীর জীবন এক বিরাট পরীক্ষা। আল্লাহ তা’আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জ্ঞান, বুদ্ধি ও চিন্তা-ভাবনার ক্ষমতা দিয়ে। পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণী এই বিশেষত্ব পায়নি। মানুষকে তিনি শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি করেছেন, দিয়েছেন জ্ঞানের আলো, রিজিকের ব্যবস্থা এবং দিয়েছেন চলার এক সোজা পথ, যা আল্লাহর পথে চলার পথ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, মানুষ সেই মহান দাতা ও সৃষ্টিকর্তার নির্দেশনা ভুলে গিয়ে অহংকারে, লালসায় ও ভোগবিলাসে মগ্ন হয়ে পড়েছে।
আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন: “আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, তারপর রিজিক দিয়েছেন, তারপর মৃত্যুদান করবেন, আবার জীবন দান করবেন।” (সূরা আর-রূম, আয়াত ৪০)
এই আয়াত স্পষ্ট প্রমাণ করে যে জীবন, মৃত্যু, রিজিক, জ্ঞান সবকিছুই আল্লাহর হাতে। মানুষ যতই চেষ্টা করুক না কেন, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কিছুই অর্জন করতে পারবে না। আমাদের প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি রুটি, প্রতিটি জ্ঞান, এমনকি একটি পানির ফোঁটাও আল্লাহর রহমতের ফসল।
তবুও মানুষ ভুলে যায় যে, তার জিহ্বা নড়ে আল্লাহর ইচ্ছায়, তার হৃদয় ধ্বনিত হয় আল্লাহর আদেশে, আর তার রিজিকের প্রতিটি দানা আসে আল্লাহর হুকুমেই।
কেন আমরা আল্লাহর পথে চলি না?
এই প্রশ্নটি যতটা গভীর, উত্তর ততটাই কষ্টদায়ক। মানুষ আল্লাহর দানভোগ করে, কিন্তু সেই দানদাতাকে ভুলে যায়। কারণ, মানুষ ভুলে যায় তার সৃষ্টি-উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি মানুষ ও জিনকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য।” (সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত ৫৬)
কিন্তু আজ মানুষ ইবাদতের বদলে ব্যস্ত দুনিয়ার চাকচিক্যে। নামায বাদ, রোযা ভুলে গেছে, জাকাতকে বোঝা মনে করে, আর হারামকে করে বৈধ জীবনের অংশ। ব্যবসায় প্রতারণা, কথায় মিথ্যা, সমাজে অন্যায় এসব যেন এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
এর মূল কারণ হলো অজ্ঞতা, ঈমানের দুর্বলতা, এবং দুনিয়ার মোহ। মানুষ মনে করে, রিজিক আসে নিজের পরিশ্রমে, আল্লাহর অনুগ্রহে নয়। অথচ আল্লাহ বলেন, “আর আকাশ ও পৃথিবীতে যত রিজিক আছে, সবই আল্লাহর কাছেই।” (সূরা যূমার, আয়াত ৩৮)
অতএব, যে মানুষ আল্লাহর পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে প্রকৃতপক্ষে নিজের অকল্যাণ ডেকে আনে।
আল্লাহর কথা না শুনলে কী অপরাধ হয়?
আল্লাহর আদেশ অমান্য করা কেবল একটি পাপ নয়, বরং এটি কৃতজ্ঞতার ঘাটতি। আল্লাহ আমাদেরকে অসীম দান করেছেন: দৃষ্টি, শ্রবণ, বুদ্ধি, জীবন ও পরিবার। অথচ সেই মহান স্রষ্টার আদেশ আমরা তুচ্ছ জ্ঞান করি। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি কৃতজ্ঞ হও না?, (সূরা সাজদা, আয়াত ৯)
আল্লাহর কথা না মানা মানে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করা। এতে মানুষের জীবনে আসে অশান্তি, বিপদ, ও অনিশ্চয়তা। পাপের জীবন যতই আরামদায়ক মনে হোক, শেষ পরিণতি সর্বদা ধ্বংস। কুরআনে এসেছে, ‘যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, আমি তার জন্য সংকীর্ণ জীবন নির্ধারণ করব।’ (সূরা ত্বাহা, আয়াত ১২৪)
অর্থাৎ, আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরে গেলে মানুষ কখনোই শান্তি পায় না। ধন, মান, ক্ষমতা সব কিছুই তাকে তৃপ্ত করতে পারে না।
আল্লাহর কথা শুনলে ও তাঁর পথে চললে কী হয়?
আল্লাহর আদেশ পালন মানে হলো শান্তি, বরকত, ও নিরাপত্তার জীবন লাভ করা।
আল্লাহ বলেন, ‘যে পুরুষ বা নারী ঈমানদার হয়ে সৎকর্ম করে, আমি অবশ্যই তাকে উত্তম জীবন দান করব।’ (সূরা নাহল, আয়াত ৯৭)
আল্লাহর পথে চলা মানে কেবল নামাজ পড়া নয় বরং হৃদয়ে আল্লাহর ভয় রাখা, মিথ্যা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকা, মানুষের হক আদায় করা, ও দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত থাকা।
আল্লাহর পথে চললে মানুষ যে প্রশান্তি পায়, তা কোনো অর্থ, পদ, বা খ্যাতি দিতে পারে না। এ কারণেই নবী করিম (সা:) বলেছেন, ‘যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে, সে ইমানের স্বাদ পায়।’ (সহিহ বুখারি)
আল্লাহর পথে না চললে তার পরিণতি কী?
যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ থেকে দূরে সরে যায়, সে ধীরে ধীরে অন্ধকারে পতিত হয়। প্রথমে সে অন্যায়ে লিপ্ত হয়, পরে অন্যায়কে বৈধ মনে করে। তারপর তার হৃদয় কঠিন হয়ে যায় আর আল্লাহর নাম শুনলেও তার হৃদয় নরম হয় না। এই অবস্থাকে কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে, আর শয়তান তাদের কাজকে শোভন করে দেখিয়েছে।’ (সূরা আনআম, আয়াত ৪৩)
এমন মানুষ শুধু দুনিয়াতে নয়, আখিরাতেও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। দুনিয়ায় সে যতো অর্জন করুক না কেন, আখিরাতে তা মূল্যহীন হবে।
আল্লাহর পথে চললে কী উপকার হয়?
আল্লাহর পথে চলা মানে হলো তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। যখন মানুষ আল্লাহর নির্দেশ মানে, তখন তার জীবনে নেমে আসে রহমত, রিজিকে আসে বরকত, মনে আসে প্রশান্তি। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বেশি দিব।’ (সূরা ইবরাহিম, আয়াত ৭)
আল্লাহর পথে চললে একজন মানুষ দুনিয়া ও আখিরাত দুই জগতেই সফল হয়। সে ধৈর্যশীল, সৎ, ও বিনয়ী হয়। অন্যদের কষ্ট বোঝে, অন্যদের সাহায্য করে, এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে। তার মুখে সর্বদা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ থাকে, কারণ সে জানে, সবকিছু আল্লাহর দান।
আল্লাহর পথে ফিরে আসার আহ্বান
আজ আমাদের সমাজে অন্যায়, মিথ্যা, প্রতারণা, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ—এসব কেন বাড়ছে? কারণ মানুষ আল্লাহর ভয় ভুলে গেছে। যদি আমরা প্রত্যেকে আল্লাহর পথে ফিরে আসি, নিজের জীবনে ইসলামকে বাস্তবায়ন করি, তাহলে সমাজে ন্যায় ও শান্তি ফিরে আসবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরাই নিজেদের পরিবর্তন করে।’ (সূরা আর-রাদ, আয়াত ১১)
অতএব, পরিবর্তনের সূচনা আমাদের নিজেদের থেকেই হতে হবে।
জীবন, জ্ঞান, বুদ্ধি, রিজিক সবকিছুই আল্লাহর দান। এই দান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করে, আমাদের কর্তব্য আল্লাহর পথে চলা, তাঁর আদেশ পালন করা এবং পাপ থেকে দূরে থাকা। দুনিয়ার সামান্য স্বার্থের জন্য আমরা যেন চিরস্থায়ী সুখের বিনিময়ে নিজেদের বিকিয়ে না দিই।
আমরা যেন আজ থেকেই বলি, ‘আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবই আল্লাহর জন্য।’ (সূরা আনআম, আয়াত ১৬২)
আসুন, আমরা সবাই আল্লাহর পথে ফিরে আসি, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। কারণ সবকিছুর মালিক তিনিই, আর তাঁর সন্তুষ্টিই হলো জীবনের প্রকৃত সাফল্য।
জেএইচআর