ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান: অদৃশ্য জগতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস

হাশেম রেজা  প্রকাশিত: অক্টোবর ২০, ২০২৫, ১১:১৬ এএম

মানুষের জীবন শুধু দৃশ্যমান জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চোখে না দেখা, কিন্তু অস্তিত্বে অনস্বীকার্য এক অদৃশ্য জগৎ রয়েছে, যেখানে বাস করেন আল্লাহর অনুগত সৃষ্টি ফেরেশতারা। ইসলামি বিশ্বাসে, ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান রাখা ঈমানের ছয়টি মৌলিক স্তম্ভের একটি। 

কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, সৎকর্মশীল সেই মানুষ, যারা আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস রাখে। (সূরা আল-বাকারা: ১৭৭)

অর্থাৎ ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস শুধু ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফেরেশতাদের অস্বীকার করা মানে ইসলামি বিশ্বাসের কাঠামো থেকে বিচ্যুত হওয়া।

অদৃশ্য কিন্তু বাস্তব অস্তিত্ব

ফেরেশতারা আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি, আলো থেকে সৃষ্ট এক বিশেষ সত্তা। কোরআনে তাদের পরিচয় এসেছে এমন এক শ্রেণি হিসেবে, যারা সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ পালন করেন, অবাধ্য হন না। তারা খায় না, ঘুমায় না, ক্লান্ত হয় না।

আল্লাহ বলেন, ফেরেশতারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না এবং যা আদেশ করা হয়, তা-ই সম্পূর্ণভাবে পালন করে। (সূরা আত-তাহরিম: ৬)

মানুষের জ্ঞান যতই বাড়ুক না কেন, ফেরেশতাদের জগত মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। অথচ তাদের উপস্থিতি মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি মুহূর্তে ছড়িয়ে আছে। আর আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত, এমনকি পরকালেও তারা সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।

ফেরেশতাদের কাজ ও দায়িত্ব

ইসলামে উল্লেখ রয়েছে, ফেরেশতারা বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত। কেউ ওহি পৌঁছে দেন, কেউ রিজিকের ব্যবস্থাপনা করেন, কেউ মানুষের কর্মলিপি লিখে রাখেন, কেউ মৃত্যুর সময় আত্মা গ্রহণ করেন।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফেরেশতার নাম ও দায়িত্ব নিম্নরূপ:

জিবরাইল (আ:) ওহি প্রেরণ ও নবীদের কাছে আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত। তিনি সকল নবী-রাসূলের কাছে আল্লাহর বাণী নিয়ে আসতেন।

মীকাইল (আ:) বৃষ্টি, রিজিক ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় নিয়োজিত।

ইসরাফিল (আ:) কিয়ামতের দিন শিঙ্গা ফুঁকবেন। তখনই সমস্ত সৃষ্টি মৃত্যুবরণ করবে এবং পুনরুত্থিত হবে।

আজরাইল (আ:) মৃত্যুর ফেরেশতা, যিনি আল্লাহর নির্দেশে আত্মা কবজ করেন।

কিরামান কাতিবিন, মানুষের ডান ও বাম পাশে অবস্থান করে আমলনামা লেখেন, একজনে সৎকর্ম, অপরজন অসৎকর্ম লিপিবদ্ধ করেন।

মুনকার ও নাকির- কবরের ফেরেশতা, যারা মৃত্যুর পর মানুষকে প্রশ্ন করবেন,‘তোমার প্রভু কে? তোমার ধর্ম কী? তোমার নবী কে?’

এই দায়িত্ববণ্টনের ভেতর দিয়ে ইসলাম ফেরেশতাদের জগতকে এক পরিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যেখানে প্রতিটি ফেরেশতা আল্লাহর নির্দিষ্ট কাজে নিয়োজিত, কখনও অবহেলা করেন না।

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমানের তাৎপর্য

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান মানুষকে গভীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শুদ্ধতার দিকে আহ্বান জানায়। কারণ এই বিশ্বাস মনে করিয়ে দেয়, আমার প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা, এমনকি চিন্তাও রেকর্ড হচ্ছে। পাশে থাকা কিরামান কাতিবিন ফেরেশতারা কখনো ভুল করেন না। এই সচেতনতা মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে, ন্যায় ও সত্যের পথে দৃঢ় রাখে।

অন্যদিকে, ফেরেশতাদের অস্তিত্বে বিশ্বাস মানুষকে বিনয়ী করে তোলে। সে বোঝে মানুষ একা নয়, সে আল্লাহর বিশাল সৃষ্টি-পরিক্রমার ক্ষুদ্র অংশমাত্র। ফেরেশতারা যেমন আল্লাহর আদেশ অমান্য করেন না, তেমনি ঈমানদারকেও শেখানো হয়,
আল্লাহর নির্দেশে আত্মসমর্পণই প্রকৃত মর্যাদা।

আধুনিক মানসিকতা ও অদৃশ্য জগতের বিশ্বাস

আজকের বিজ্ঞানের যুগে অদৃশ্য কোনো বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস রাখা অনেকের কাছে ‘অতিলৌকিক’ মনে হয়। কিন্তু ইসলাম এখানে একটি গভীর ভারসাম্য স্থাপন করে।

কোরআনে বলা হয়েছে, এরা সেইসব মানুষ, যারা অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনে। (সূরা আল-বাকারা: ৩)

অর্থাৎ, প্রকৃত ঈমানদার কেবল দেখা বিষয়েই বিশ্বাস রাখে না, বরং অদৃশ্যের ওপর তার আস্থা থাকে যা যুক্তি, প্রকাশ ও অনুভূতির সীমার বাইরে। বিজ্ঞান যেভাবে পরমাণু, মাধ্যাকর্ষণ বা বিদ্যুৎকে দৃশ্যমান না হয়েও বাস্তব বলে মেনে নেয়, তেমনি ইসলাম মানুষকে আহ্বান জানায় বিশ্বাস করতে যা আল্লাহ প্রকাশ করেছেন, তা সত্য।

ফেরেশতাদের অস্বীকারের বিপদ

ইসলামী বিশ্বাসে ফেরেশতাদের অস্বীকার করা গুরুতর অপরাধ। কোরআনে ফেরেশতাদের প্রতি অবিশ্বাসকে কুফরি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, কিতাব, রাসূল এবং পরকালের প্রতি অবিশ্বাস করে, সে গুরুতর বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছে। (সূরা আন-নিসা: ১৩৬)

ইসলামের ইতিহাসে কিছু ভ্রান্ত মতবাদ দেখা দিয়েছে যারা ফেরেশতাদের অস্তিত্বকে রূপক বা কল্পনা বলে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু মূলধারার ইসলাম, কোরআন ও হাদিসভিত্তিক বিশ্বাস, ফেরেশতাদের বাস্তব অস্তিত্বকে অস্বীকারের কোনো সুযোগ দেয় না।

ফেরেশতা ও মানবজীবনের সম্পর্ক

মানুষের জীবনের প্রতিটি ধাপে ফেরেশতারা উপস্থিত। নবজাতকের জন্মের সময় ফেরেশতা তার কানে আজান দেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তারা পাহারা দেন, মৃত্যুর সময় আত্মা কবজ করেন, আর কিয়ামতের দিন তারা সাক্ষী হবেন।

প্রবীণ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে দুটি ফেরেশতা নিয়োজিত থাকে, একজন ডান দিকে, অন্যজন বাম দিকে। ডান দিকের ফেরেশতা সৎকর্ম লিখে রাখেন, আর বাম দিকের ফেরেশতা অসৎকর্ম।

এই বিশ্বাস মানুষকে এক অদৃশ্য নৈতিক পাহারায় রাখে। কেউ দেখুক বা না দেখুক, ঈমানদার জানে, আল্লাহর প্রতিনিধি ফেরেশতারা তার আমল লিপিবদ্ধ করছেন। ফলে সমাজে গড়ে ওঠে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি।

আখিরাতে ফেরেশতাদের ভূমিকা

আখিরাত বা পরকালেও ফেরেশতাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মৃত্যুর পর কবরের প্রশ্নোত্তর থেকে শুরু করে কিয়ামতের দিনে মানুষের হিসাব গ্রহণ, জান্নাত-জাহান্নামে দায়িত্ব সবখানেই তাদের উপস্থিতি থাকবে।

কোরআনে বলা হয়েছে, যেদিন ফেরেশতারা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে, তখন কেউ কথা বলতে পারবে না, শুধুমাত্র যাকে রহমান অনুমতি দেবেন। (সূরা আন-নাবা: ৩৮)

জান্নাতে ফেরেশতারা ঈমানদারদের অভিনন্দন জানাবে, তোমরা শান্তিতে প্রবেশ করো, তোমরা নিরাপদে আছো। অন্যদিকে, জাহান্নামে ফেরেশতারা শাস্তি কার্যকর করবেন অবিশ্বাসীদের জন্য।

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান: এক প্রশান্ত বিশ্বাস

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান শুধু ধর্মীয় অনুশাসন নয়, এটি মানুষের অন্তরে প্রশান্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি জাগায়। মানুষ বুঝতে শেখে সে একা নয়, আল্লাহর নিযুক্ত ফেরেশতারা সর্বদা তাকে পাহারা দিচ্ছেন, তার দোয়ার সাক্ষী হচ্ছেন, তার সৎকর্মে আনন্দিত হচ্ছেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে স্থানে আল্লাহকে স্মরণ করা হয়, সেখানে ফেরেশতারা ভিড় করে, রহমতের মেঘ তাদের ঢেকে নেয় এবং আল্লাহ তা’আলা তাদের স্মরণ করেন। (সহিহ মুসলিম)

এই হাদিস আমাদের শেখায়, ফেরেশতারা কেবল আকাশে নয়, তারা আমাদের চারপাশে, আমাদের আচার-আচরণে উপস্থিত।

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবজীবনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে এক মহাজাগতিক শৃঙ্খলা। এই শৃঙ্খলা পরিচালনা করেন আল্লাহ তায়ালা, আর ফেরেশতারা তাঁর নির্দেশের নিখুঁত বাহক। যে মানুষ ফেরেশতাদের অস্তিত্বে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে, তার ঈমান হয় পরিপূর্ণ, তার মন হয় সজাগ, হৃদয় হয় বিনয়ী, জীবন হয় দায়িত্বশীল।

আজকের বস্তুবাদী পৃথিবীতে ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয় এটি মানবতার শুদ্ধতর চেতনার প্রতীক। কারণ, যিনি জানেন যে অদৃশ্য ফেরেশতা তার প্রতিটি আমল লিখে রাখছে, তিনি অন্যায় করতে পারেন না।

যিনি বিশ্বাস করেন যে জিবরাইল (আ:) ওহি এনেছেন, তিনি জ্ঞানের মর্যাদা বোঝেন।
আর যিনি জানেন যে আজরাইল (আ:) একদিন আত্মা কবজ করবেন, তিনি সময়কে মূল্য দেন।

অতএব, ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান মানে অদৃশ্যের প্রতি আস্থা, ন্যায়ের প্রতি আনুগত্য, আর আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ।

জেএইচআর