ইফতার করার নিয়ম, দোয়া ও নিয়ত, রোজাদারের বরকতময় মুহূর্ত

ধর্ম ডেস্ক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫, ০৫:৪৫ পিএম

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আসে। দিনের দীর্ঘ সময় রোজা পালনের পর সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে যে মুহূর্তটি আসে, তা হলো ইফতারের সময়। ইফতার শুধু রোজা ভাঙার আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আল্লাহর আদেশ পালন শেষে তাঁর দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ইফতার করার সঠিক নিয়ম, দোয়া ও নিয়ত জানা প্রত্যেক রোজাদারের জন্য জরুরি।

‘ইফতার’ শব্দের অর্থ রোজা ভাঙা। শরিয়তের পরিভাষায়, সূর্যাস্তের পর আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্ধারিত উপায়ে রোজা শেষ করাকে ইফতার বলা হয়। সূর্য ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করা সুন্নাহ এবং এতে বিলম্ব করা অনুচিত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ ততদিন কল্যাণের ওপর থাকবে, যতদিন তারা ইফতার করতে দেরি করবে না। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, সময়মতো ইফতার করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। ইফতার মুহূর্তটি দোয়া কবুলের বিশেষ সময় হিসেবেও বিবেচিত।

ইফতার করার ক্ষেত্রে ইসলামে কিছু সুন্নাহ ও আদব রয়েছে:

সূর্যাস্ত নিশ্চিত করা: ইফতার করার আগে সূর্য অস্ত গেছে, এটি নিশ্চিত হওয়া জরুরি। আজানের শব্দ শোনা বা নির্ভরযোগ্য সময়সূচি অনুসরণ করা উত্তম।

তাড়াতাড়ি ইফতার করা: সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা সুন্নাহ। অকারণে বিলম্ব করা উচিত নয়।

খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার: রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণত খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। খেজুর না থাকলে পানি দিয়ে ইফতার করা সুন্নাহ।

অল্প দিয়ে শুরু করা: ইফতারের শুরুতে অল্প পরিমাণ খাবার গ্রহণ করা উত্তম। এতে শরীরের ওপর চাপ কম পড়ে এবং সুন্নাহ অনুসরণ হয়।

মাগরিবের নামাজ দ্রুত আদায়: ইফতার শেষে মাগরিবের নামাজ আদায় করা উত্তম। এরপর মনোযোগসহকারে খাবার গ্রহণ করা যেতে পারে।

নিয়ত মূলত অন্তরের কাজ। ইফতারের সময় আলাদা করে মুখে নিয়ত পড়া ফরজ নয়। রোজার নিয়ত আগেই করা হয়ে থাকে। তবে ইফতারের মুহূর্তে অন্তরে এই অনুভূতি থাকা জরুরি যে, আল্লাহর নির্দেশ পালনের পর তাঁর অনুমতিতেই রোজা ভাঙা হচ্ছে।

অনেকে প্রচলিতভাবে বলেন, হে আল্লাহ, তোমারই জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেওয়া রিজিক দিয়ে ইফতার করছি। এটি দোয়ার অন্তর্ভুক্ত এবং পড়া জায়েজ।

ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়, এ বিষয়ে হাদিসে ইঙ্গিত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত একটি দোয়া হলো:

বাংলায় উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজক্বিকা আফতারতু। অর্থ: হে আল্লাহ! তোমারই জন্য আমি রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেওয়া রিজিক দিয়ে আমি ইফতার করছি।

বাংলায় উচ্চারণ: যাহাবায্ যামা’উ ওয়াবতাল্লাতিল উরুক, ওয়া সাবাতাল আজর ইন শা আল্লাহ। অর্থ: তৃষ্ণা দূর হয়েছে, শিরাগুলো সিক্ত হয়েছে এবং ইনশা আল্লাহ সওয়াব স্থির হয়েছে।

ইফতারের সময় দোয়া করার সময় আন্তরিকতা, বিনয় ও কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত। নিজের গুনাহ মাফ, দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, পরিবার ও উম্মাহর জন্য দোয়া করা উত্তম।

যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করে, এ বিষয়ে হাদিসে সুস্পষ্ট ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এটি সামাজিক সহমর্মিতা ও দানশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ইফতারের সময় অপচয়, অতিরিক্ত ভোজ বা প্রদর্শনী থেকে বিরত থাকা জরুরি। ইফতার যেন সংযম ও কৃতজ্ঞতার শিক্ষা বহন করে।

ইফতার আমাদের শেখায় ধৈর্যের পুরস্কার এবং আল্লাহর দয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা। এটি পরিবার ও সমাজের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে।

ইফতার রোজাদারের জন্য এক আনন্দময় ও বরকতময় মুহূর্ত। সঠিক নিয়মে, সুন্নাহ অনুযায়ী ইফতার করা এবং আন্তরিক দোয়া ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে এ সময়টি অতিবাহিত করলে রোজার পূর্ণতা অর্জিত হয়। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত ইফতার করার নিয়ম, দোয়া ও নিয়ত সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং এই পবিত্র মুহূর্তকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।

জেএইচআর