মিরাজ

মহাকাশ ভ্রমণের পথে নবীজির দেখা জান্নাত-জাহান্নামের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি

আমার সংবাদ ধর্ম ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১০, ২০২৬, ১০:১০ পিএম

পবিত্র মিরাজ রজনীতে বোরাকে আরোহণ করে যখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে যাত্রা করছিলেন, তখন মহান আল্লাহ তাকে সৃষ্টিজগতের এমন কিছু গূঢ় রহস্য ও পরকালের প্রতিফল দেখান, যা সাধারণ মানুষের কল্পনার অতীত। এই সফরটি ছিল আধ্যাত্মিক এবং শারীরিক, উভয় দিক থেকেই অনন্য। সফরের শুরুতেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক বৃদ্ধাকে দেখতে পান, যে তাকে ব্যাকুল হয়ে ডাকছিল। কিন্তু জিবরাঈল আলাইহিস সালামের নির্দেশে নবীজি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সামনে এগিয়ে যান। 

কিছুদূর যাওয়ার পর এক বৃদ্ধ ব্যক্তিও তাকে আহ্বান জানায়। পরবর্তীতে জিবরাঈল আলাইহিস সালাম রহস্য উন্মোচন করে বলেন, সেই বৃদ্ধা ছিল এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রতীক। আর বৃদ্ধ লোকটি ছিল অভিশপ্ত শয়তান। তারা উভয়েই উম্মতে মুহাম্মদীকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য সদা সচেষ্ট। নবীজির সেদিকে ফিরে না তাকানোর অর্থ হলো, উম্মতের মুক্তির একমাত্র পথ হলো দুনিয়া ও শয়তানের মায়াজাল ছিন্ন করে আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া।

মিরাজের পথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন এক জামাআতের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা তাকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে সালাম পেশ করছিলেন। তারা বলছিলেন, আসসালামু আলাইকা ইয়া আউয়াল, আসসালামু আলাইকা ইয়া আখির, আসসালামু আলাইকা ইয়া হাশির। জিবরাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে জানা গেল, তারা ছিলেন হজরত মুসা আলাইহিস সালাম ও হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম। 

এমনকি সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত মুসা আলাইহিস সালামকে তার কবরে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে দেখেন। এটি প্রমাণ করে যে, আম্বিয়ায়ে কেরাম কবরেও জিন্দা এবং তারা সেখানেও ইবাদতে মশগুল থাকেন।

মিরাজ কেবল পুরস্কারের গল্প নয়, এটি অপরাধীদের জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কবাণী। পথিমধ্যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাপাচারীদের বিভিন্ন প্রকার শাস্তির দৃশ্য দেখেন। তিনি দেখেন একদল মানুষ তামার নখ দিয়ে নিজেদের মুখ ও বুক আঁচড়াচ্ছে। জিবরাঈল আলাইহিস সালাম জানান, এরা দুনিয়াতে মানুষের গিবত বা পরনিন্দা করত এবং অন্যের সম্মানহানি করত। 

এক ব্যক্তিকে রক্তের নদীতে সাঁতার কাটতে দেখা যায়, যে তীরে আসার চেষ্টা করলে ফেরেশতারা তার মুখে পাথর নিক্ষেপ করে পুনরায় নদীর মাঝখানে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তারা ছিল দুনিয়ার রক্তচোষা সুদখোর। অন্য একদল লোকের মাথা বিশাল পাথর দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হচ্ছিল। মাথা চূর্ণ হওয়ার পর পুনরায় তা ঠিক হয়ে যাচ্ছিল এবং আবার শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। এরা ছিল সেইসব দুর্ভাগা, যারা ফরজ নামাজ আদায়ে অলসতা করত। 

নবীজি আরও দেখলেন, একদল লোকের সামনে সুস্বাদু রান্না করা গোশত থাকা সত্ত্বেও তারা পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত কাঁচা গোশত খাচ্ছে। এরা দুনিয়াতে বৈধ স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হতো।

শাস্তির পাশাপাশি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুমিনদের জন্য মহান আল্লাহর অফুরন্ত রহমতের নিদর্শনও দেখেন। তিনি দেখেন এক ব্যক্তি ফসল কাটছে, আর কাটার সাথে সাথেই তা দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসছে। এটি হলো আল্লাহর পথে জান ও মাল দিয়ে প্রচেষ্টাকারীদের উদাহরণ, যাদের একটি নেক আমলকে আল্লাহ সাতশ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। এক স্থানে অত্যন্ত শীতল ও পবিত্র সুগন্ধ অনুভব করেন নবীজি। জিবরাঈল আলাইহিস সালাম জানান, এটি হলো জান্নাতের বাতাস যা মুমিনদের জন্য অপেক্ষা করছে।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও কিছু প্রতীকী শাস্তি প্রত্যক্ষ করেন যা আজকের সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যারা সম্পদ থাকা সত্ত্বেও জাকাত দেয়নি, তাদের নগ্ন অবস্থায় জাহান্নামের কাঁটাযুক্ত ঘাস ও পাথর খেতে দেখা যায়। এমন কিছু লোক দেখা যায় যারা বিশাল বোঝা বহন করতে পারছে না, তবুও আরও বোঝা চাইছে। 

এরা হলো অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও পদের লোভ করা মানুষ। আবার কিছু লোকের জিহ্বা ও ঠোঁট লোহার কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছিল, এরা ছিল সেইসব বক্তা যারা মানুষকে ভালো উপদেশ দিত কিন্তু নিজেরা তা পালন করত না। এই সফরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাজ্জালকে তার প্রকৃত রূপে দেখার সুযোগ পান, যা উম্মতের জন্য ফিতনা চেনার এক বড় মাধ্যম। এ ছাড়া তিনি জাহান্নামের প্রধান প্রহরী ফেরেশতা মালিককেও প্রত্যক্ষ করেন, যার চেহারায় কখনো হাসির রেখা ফুটে ওঠে না।

মিরাজের এই পুরো সফরটি ছিল সিদরাতুল মুনতাহা বা আল্লাহর আরশে পৌঁছানোর আগের প্রস্তুতি। বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছানোর আগেই নবীজিকে মানব চরিত্রের ভালো ও মন্দের পরিণাম দেখানো হয়েছিল। মিরাজ আমাদের শেখায় যে নামাজ মুমিনের মিরাজ, তাই এতে কোনো অবহেলা করা যাবে না। পরনিন্দা ও সুদ সমাজকে ধ্বংস করে, যার পরকালীন শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ।

 দুনিয়ার চাকচিক্য শয়তানের ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং আলেম বা বক্তাদের কথায় ও কাজে মিল থাকা অপরিহার্য। আজকের এই আধুনিক যুগেও মিরাজের এই শিক্ষাগুলো সমানভাবে কার্যকর। প্রতিটি মুমিনের উচিত মিরাজের এই ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করা।

জেএইচআর