মানব হত্যা মহাপাপ: পরকালীন ভয়াবহতা 

ধর্ম ডেস্ক প্রকাশিত: মে ৮, ২০২৬, ০৭:৫৯ এএম
প্রতীকী ছবি

ইসলাম শান্তি ও মানবতার ধর্ম। এখানে মানুষের জীবনের মূল্য অত্যন্ত বেশি। পবিত্র কুরআনে একজন নির্দোষ মানুষকে হত্যা করাকে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমান অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক যুগে তুচ্ছ কারণে রক্তপাত এবং প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে মানুষ খুনের মতো জঘন্য অপরাধ বেড়েই চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে মানুষ হত্যার পরিণাম এবং এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি অত্যন্ত ‘কঠিন’ ও সতর্কতামূলক হাদিস নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আলোচনা।

মানব হত্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে সেই ‘কঠিন’ হাদিস

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে বিষয়ের ফয়সালা করা হবে, তা হলো রক্তপাত (হত্যাকাণ্ড)। (সহিহ বুখারি: ৬৮৬৪, সহিহ মুসলিম: ১৬৭৮)
এই হাদিসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং শিউরে ওঠার মতো। সাধারণত আমরা জানি, কিয়ামতের দিন ইবাদতের মধ্যে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। কিন্তু মানুষের পারস্পরিক অধিকার বা ‘হক্বুল ইবাদ’-এর ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম বিচার হবে খুনের। মহান আল্লাহ তায়ালা হাশরের ময়দানে কোনো চুরির বিচার বা মিথ্যার বিচার দিয়ে শুরু করবেন না, বরং শুরু করবেন মানুষের প্রবাহিত রক্ত দিয়ে। এটিই প্রমাণ করে ইসলামে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কতটা স্পর্শকাতর।

আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে নির্দোষের রক্তে

মানুষ হত্যার অপরাধ কতটা ভয়াবহ তা অন্য একটি হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে একজন মুমিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার চেয়েও সহজতর।(সুনানে তিরমিজি: ১৩৯৫)। অর্থাৎ, মহান আল্লাহর কাছে পৃথিবীর সমস্ত পাহাড়, পর্বত, সাগর ও আসমানের চেয়েও একজন মানুষের জীবনের মূল্য বেশি।

খুনের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক কুফল

ইসলামি শরীয়তে ‘কবিরা গুনাহ’ বা মহাপাপগুলোর তালিকা করলে শিরকের পরপরই যে অপরাধটির নাম আসে, তা হলো নরহত্যা। এর কুফল বহুমুখী:

স্থায়ী জাহান্নাম: পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি হবে জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে লানত করবেন এবং তার জন্য ভয়াবহ শাস্তি প্রস্তুত রাখবেন। (সূরা আন-নিসা: ৯৩)।

তওবার পথ রুদ্ধ হওয়া: ওলামায়ে কেরামের মতে, খুনের অপরাধে তওবা করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ এর সাথে নিহত ব্যক্তির অধিকার জড়িত। আল্লাহ চাইলে নিজের হক ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু বান্দার হক ততক্ষণ ক্ষমা করেন না যতক্ষণ না বান্দা নিজে ক্ষমা করে। যেহেতু নিহত ব্যক্তি দুনিয়াতে নেই, তাই তার কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সামাজিক অস্থিরতা: একটি খুন কেবল একটি মানুষের মৃত্যু নয়, বরং এটি একটি পরিবারের ধ্বংস এবং একটি সমাজের শান্তি বিনষ্ট হওয়ার নামান্তর।

কিয়ামতের ময়দানে বিচার যেভাবে হবে

হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, কিয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হবে। নিহত ব্যক্তির কাটা মাথা তার নিজের হাতে থাকবে এবং সে হত্যাকারীর গলার ঝুঁটি ধরে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! একে জিজ্ঞাসা করুন, কেন সে আমাকে হত্যা  করেছিল?(সুনানে নাসায়ি)। সেই কঠিন মুহূর্তে আল্লাহর আরশের সামনে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর হত্যাকারীর কাছে থাকবে না।

সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজের অন্যতম

রাসুলুল্লাহ (সা.) মুমিনদের সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ (আল-মুবিকাত) থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। এই তালিকায় আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং জাদুর পরই স্থান পেয়েছে 'আল্লাহ যাকে হারাম করেছেন তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা। এটি একজন ব্যক্তির আমলনামাকে এমনভাবে ধ্বংস করে দেয় যে, তার বিগত জীবনের সমস্ত ইবাদত বিফলে যাওয়ার উপক্রম হয়।

ফেতনা ও হত্যাকাণ্ড: শেষ জামানার লক্ষণ

বর্তমান বিশ্বে আমরা যে রক্তপাত দেখছি, তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীরই অংশ। তিনি বলেছিলেন, কিয়ামতের আগে ‘হারজ’ বৃদ্ধি পাবে। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, হারজ কী? তিনি বললেন, 'হত্যাকাণ্ড। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এমন হবে যে, হত্যাকারী জানবে না সে কেন হত্যা করছে এবং নিহত ব্যক্তি জানবে না কেন তাকে মারা হলো। আজ রাজনীতির নামে, ব্যক্তিগত ক্ষোভের নামে বা তুচ্ছ স্বার্থের কারণে আমরা সেই অন্ধকার যুগেই যেন ফিরে যাচ্ছি।

ইসলামের বিধান: জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ

ইসলাম কেবল পরকালীন শাস্তির ভয় দেখায়নি, বরং দুনিয়াতেও খুনের কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করেছে। ‘কিসাস’ বা জানের বদলে জানের বিধান দেওয়া হয়েছে যাতে কেউ অন্যকে আঘাত করার আগে শতবার চিন্তা করে। এটি কোনো প্রতিহিংসা নয়, বরং ন্যায়বিচার ও শান্তির গ্যারান্টি। 

পবিত্র কুরআন বলা হয়েছে, হে বুদ্ধিমানগণ! কিসাসের মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে। (সূরা আল-বাকারাহ: ১৭৯)। 

নরহত্যা বা খুন কেবল তলোয়ার বা অস্ত্রের আঘাত নয়, এটি মানুষের নিষ্ঠুরতা ও অহংকারের চূড়ান্ত রূপ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই কঠিন হাদিসটি আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট যে, হাশরের প্রথম বিচারই হবে রক্তের।

একজন প্রকৃত মুসলিম কখনো অন্যের রক্তে নিজের হাত রাঙাতে পারে না। আমাদের উচিত অন্তরে আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) লালন করা এবং প্রতিটি মানুষের জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। কারণ মানুষের জীবন আল্লাহর দেওয়া একটি পবিত্র আমানত, আর এই আমানতের খিয়ানতকারী আল্লাহর কাছে কখনোই রেহাই পাবে না।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে তিরমিজি, সূরা আন-নিসা ও সূরা আল-বাকারাহ (আল-কুরআন)।

এএন