পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান আমল হলো আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা। এটি ইসলামের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও মহৎ ইবাদত। কোরবানি করার মূল উদ্দেশ্যই হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাকওয়া অর্জন করা এবং ত্যাগের মহিমায় নিজেকে উজ্জীবিত করা।
কোরবানিদাতার মনের ইচ্ছা ও নিয়ত কেমন, সেটিই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো ধরনের লোক দেখানো মনোভাব বা পার্থিব সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে কোরবানি করা হলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কোরবানির পশুর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। আল্লাহর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া বা আল্লাহভীতি।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)।
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানি সম্পন্ন করার পর এর গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনদের উপহার দেওয়া এবং সমাজের দরিদ্র মানুষদের মাঝে বিতরণ করার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তা থেকে নিজেরা খাও এবং অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রদের খাওয়াও।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৬)।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, কোরবানির গোশত জমা রেখে পরবর্তীতে বিয়ে বা অলিমার (বৌভাত) মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিথিদের খাওয়ানো যাবে কি না। ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, কোরবানির গোশত দিয়ে বিয়ে কিংবা অলিমার অনুষ্ঠান করতে মৌলিকভাবে কোনো ধরনের বাধা বা সমস্যা নেই। আল্লাহর হুকুম যথাযথভাবে পালন করার পর সেই বৈধ গোশতের অংশ থেকে যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়ন করা সম্পূর্ণ জায়েজ।
তবে এই ক্ষেত্রে নিয়তের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কোরবানি না করে, বরং কেবলই বিয়ে বা কোনো অনুষ্ঠানের গোশতের অভাব পূরণ করার উদ্দেশ্যে পশু জবাই করে, তবে তাঁর কোরবানি বাতিল হয়ে যাবে।
শুধু তাই নয়, বড় পশুর ক্ষেত্রে যদি কেউ এমন নিয়তকারীর সঙ্গে অংশীদার বা শরিক হন, তবে ওই নিয়তের কারণে বাকি অংশীদারদের কোরবানিও শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ হবে না। কারণ, কোরবানি হতে হবে একান্তই আল্লাহর ইবাদতের নিয়তে। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩০৪)।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব বা উত্তম। এর এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং বাকি এক ভাগ সমাজের গরিব-দুঃখীদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া উচিত। যদিও এই তিন ভাগ করা বাধ্যতামূলক বা ফরজ কোনো নিয়ম নয়, তবুও ইসলামের প্রকৃত চেতনা ও সমতার স্বার্থে এভাবে বণ্টন করাই সবচেয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ। (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২২৪)।
তবে সাধারণ কোরবানির গোশত সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা জায়েজ হলেও, মান্নতের কোরবানির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও কঠোর বিধান রয়েছে। মান্নতের পশুর গোশত কোনো ধনী ব্যক্তি, কোরবানিদাতা নিজে কিংবা তাঁর ওপর যাদের ভরণপোষণের আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্ব রয়েছে (যেমন সন্তান বা স্ত্রী), তাঁরা কেউ খেতে পারবেন না।
মান্নতের গোশত কেবল সমাজের দরিদ্র ও অভাবী মানুষের হক। ফলে, মান্নতের কোরবানির গোশত দিয়ে যদি বিয়ে বা অলিমার মতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে ধনী-দরিদ্র সব শ্রেণির অতিথি উপস্থিত থাকেন, তবে তা ধর্মীয়ভাবে বৈধ হবে না এবং নানামুখী জটিলতার সৃষ্টি করবে। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ৪৭৩)।
জেএইচআর