ভারতের টেস্ট ক্রিকেটে চলমান ধস যেন থামছেই না। ঘরের মাঠে যেখানে ভারত বহু বছর ধরে অপ্রতিরোধ্য ছিল, সেখানেই পরপর দুইটি সিরিজে হোয়াইটওয়াশের তিক্ত স্বাদ নিতে হয়েছে তাদের। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সর্বশেষ ২–০ ব্যবধানে পরাজয়ের পর দলীয় পারফরম্যান্স যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তেমনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন দলের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর।
সাবেক ভারতীয় ওপেনারের খেলোয়াড়ি জীবন ছিল আগ্রাসন, আবেগ ও জয়ের তীব্র ক্ষুধায় ভরপুর। কিন্তু কোচিংয়ে সেই একই বৈশিষ্ট্য কতটা ফলপ্রসূ এই প্রশ্নই তুলেছেন সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকান তারকা ক্রিকেটার এবি ডি ভিলিয়ার্স।
একটি অনুষ্ঠানে নিজের মূল্যায়নে ডি ভিলিয়ার্স বলেন, তিনি গম্ভীরকে একজন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ক্রিকেটার হিসেবে চেনেন। প্রশ্ন হলো, তিনি কি সেই আবেগ নিয়েই ড্রেসিং রুম পরিচালনা করছেন। সাধারণত অতিরিক্ত আবেগী কোচ দলকে স্থিরতা দিতে পারে না।
তার মতে, কোচিং মানসিকতা ও খেলোয়াড়ি আচরণের মধ্যে বড় ফারাক থাকে। একজন কোচকে বরং ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে হয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় দলের ঘাটতি চিহ্নিত করতে হয় এবং খেলোয়াড়দের ভুল সংশোধন শেখাতে হয়।
ডি ভিলিয়ার্স আরও বলেন, সব দল একইরকম পরিবেশে সাড়া দেয় না। কিছু খেলোয়াড় অত্যন্ত অভিজ্ঞ সাবেক ক্রিকেটারের সঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আবার অনেকে মাঠে না খেললেও অভিজ্ঞ কোচিং মেন্টরদের কাছ থেকে বেশি মূল্য পায়।
তার বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, গম্ভীরের ওপর সমালোচনা নয়, বরং তার নেতৃত্বশৈলীর উপযোগিতা নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
ভারত বিগত দুই দশকে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সেরা সময় পার করেছে। বিশেষ করে ঘরের মাঠে টেস্টে পরাজয় ছিল নিতান্ত বিরল ঘটনা। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে সেই শক্ত ঘাঁটিই যেন ভেঙে পড়ছে।
ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩–০ হোয়াইটওয়াশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২–০ হার। দলীয় ব্যর্থতার কারণে শুধু খেলোয়াড় নয়, কোচিং কাঠামোকেও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, দলীয় রোটেশন, ব্যাটিং অর্ডারে অস্থিরতা, ওভার-আগ্রাসী সিদ্ধান্ত এবং চাপে অস্থিরতা দলের ব্যর্থতার মূল কারণ।
ডি ভিলিয়ার্স শান্ত কোচ শুকরি কনরাডের সাফল্য তুলে ধরেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ দীর্ঘদিন ঘরোয়া ক্রিকেটে কোচিং করেছেন। তার নেতৃত্বে নতুন একটি টেস্ট ইউনিট তৈরি হচ্ছে, যা ভারতকে ঘরের মাঠে হোয়াইটওয়াশ করেছে।
ডি ভিলিয়ার্স বলেন, কনরাডের সিদ্ধান্তগুলো পরিসংখ্যান ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকে আসে। তিনি খেলোয়াড়দের সঙ্গে ধৈর্য নিয়ে কাজ করেন। শুধু ম্যাচ খেলা নয়, খেলোয়াড়রা দীর্ঘদিনের একজন শান্ত, স্থির কোচের উপর ভরসা করতে পারে। এই ভরসাই তাদের মাঠে সাহসী করে তোলে।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড গম্ভীরের উপর অস্থির হয়ে উঠছে এমন গুঞ্জন থাকলেও বোর্ডের সূত্র জানাচ্ছে, তারা হুট করে সিদ্ধান্ত নিতে চান না। গম্ভীরের চুক্তি ২০২৭ সাল পর্যন্ত। বোর্ডের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরিকল্পনার সম্পূর্ণ রূপ দিতে গম্ভীরকে সময় দেওয়া হবে। তাদের মতে, গম্ভীরের টিম-বিল্ডিং কৌশল দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যর্থতার চাপ সামলাতে সময় প্রয়োজন। ভারতীয় ক্রিকেট কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনার লক্ষ্য এখনও পূর্ণতা পায়নি।
ডি ভিলিয়ার্স ‘আবেগপ্রবণতা ক্ষতিকর’ বললেও, ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের মতে, আবেগ নেতৃত্বে শক্তি হতে পারে যদি তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়। অধিনায়ক কোহলিও ছিলেন আবেগী, তবুও অসংখ্য জয় এসেছে। গম্ভীরের আগ্রাসন কখনো কখনো ভারতকে কঠিন ম্যাচে লড়াই করতে সাহায্য করতে পারে।
তবে একইসঙ্গে তারা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত আবেগ খেলোয়াড়দের ওপর চাপ বাড়াতে পারে, ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি থাকে এবং ড্রেসিং রুমে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ আবেগের ব্যবহারই নির্ধারণ করবে ফলাফল ইতিবাচক হবে কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় ক্রিকেটে বড় পরিবর্তনের সময় এসেছে। অভিজ্ঞদের পাশাপাশি নতুনদের সুযোগ দিতে হবে, ঘরোয়া লিগের পারফরম্যান্সকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে এবং টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সাফল্য সম্ভব নয়। স্থির ও অভিজ্ঞ কোচিং সেটআপই পারে এই সংকট কাটাতে।
এবি ডি ভিলিয়ার্সের মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, কিন্তু তিনি সতর্ক বার্তাও দিয়েছেন। নেতৃত্ব শুধু আবেগ নয়, বরং মানসিক স্থিরতা ও কৌশলগত বুদ্ধিমত্তারও সমন্বয়। ভারতের টেস্ট ব্যর্থতার দায়-দায়িত্ব কার তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু দলের ভিত মজবুত করতে হলে গম্ভীরকে তার কোচিং দর্শন ও নেতৃত্বশৈলীতে নতুন পদ্ধতি খুঁজতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আবেগ নয়, স্থিরতা, পরিকল্পনা এবং আত্মবিশ্বাসই দলকে সাফল্যের পথে এগিয়ে দেয়।
ইএএচ