তামিমকে বিসিবি পরিচালকের ‘ভারতীয় এজেন্ট’ আখ্যা

উত্তাল ক্রিকেটপাড়া, ক্ষমা চাওয়ার দাবি সতীর্থদের

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে মাঠের লড়াই ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে বোর্ড কর্মকর্তার শিষ্টাচার বহির্ভূত মন্তব্য। আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভারতে খেলতে যাওয়া না-যাওয়া সংক্রান্ত বিতর্কে নিজের ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের তোপের মুখে পড়েছেন দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল।

তামিমকে সরাসরি ভারতীয় এজেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করায় জাতীয় দলের সিনিয়র ও জুনিয়র ক্রিকেটাররা নজিরবিহীনভাবে একজোট হয়ে প্রতিবাদে নেমেছেন।

ঘটনার মূলে রয়েছে ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। মুস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তার অজুহাতে বাংলাদেশ দলের ভারতে খেলা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। সরকারের উচ্চপদস্থ পর্যায় থেকে খেলা ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার আলোচনার মধ্যে তামিম ইকবাল গত পরশু একটি অনুষ্ঠানে নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন।

তামিম সেখানে ভারতের সাথে ক্রিকেটের সম্পর্ক এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন। তামিমের এই যৌক্তিক বিশ্লেষণকে ভালোভাবে নেননি বিসিবির অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তামিমের একটি ছবি সম্বলিত কার্ড শেয়ার করে ক্যাপশনে লিখেন, এইবার আরো একজন পরীক্ষিত ভারতীয় এজেন্ট এর আত্মপ্রকাশ বাংলার জনগণ দুচোখ ভরে দেখলো।

তামিমকে নিয়ে এমন চরম আপত্তিকর মন্তব্যের পর চারদিকে নিন্দার ঝড় উঠলে নাজমুল ইসলাম পুনরায় আরেকটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন যে, যেখানে ক্রীড়া উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ভারতের নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে ম্যাচ সরানোর কথা বলছেন, সেখানে তামিম ভারতীয়দের হয়ে ব্যাট করছেন। তবে স্ট্যাটাসের শেষে তিনি বিষয়টিকে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত বলে দাবি করেন। যদিও একজন বোর্ড পরিচালকের পদে থেকে জাতীয় বীরের প্রতি এমন ব্যক্তিগত আক্রমণকে কেউই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারছেন না।

বিসিবি পরিচালকের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের প্রতিবাদে সবার আগে সরব হন জাতীয় দলের বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানান যে, এমন বক্তব্য শুধু রুচিহীনই নয়, বরং অগ্রহণযোগ্য। তাইজুল দাবি করেন, একজন বোর্ড পরিচালকের এমন আচরণবিধি লঙ্ঘন করার দায়ে তাকে জনসম্মুখে ক্ষমা চাইতে হবে এবং জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। টেস্ট দলের সাবেক অধিনায়ক মুমিনুল হক তার ফেসবুকে দীর্ঘ এক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 

তিনি লিখেছেন, একজন সিনিয়র ক্রিকেটারকে ন্যূনতম সম্মানও দেওয়া হয়নি, বরং তাকে জনসম্মুখে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করা হয়েছে। মুমিনুলের মতে, নাজমুল ইসলামের মন্তব্যে নূন্যতম শিষ্টাচারবোধের অভাব রয়েছে এবং এটি পুরো ক্রিকেট সমাজের জন্য এক বড় ধরনের অপমান। স্পিডস্টার তাসকিন আহমেদও নীরব থাকেননি। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন যে, দেশের হয়ে বড় অবদান রাখা একজন ক্রিকেটারকে নিয়ে এমন মন্তব্য দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে সহায়ক নয়। তিনি সংশ্লিষ্ট মহলকে অর্থাৎ বিসিবিকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান।

ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব বা ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এই ঘটনায় স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ। তারা এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে যে, ১৬ বছর ধরে দেশের সেবা করা একজন ক্রিকেটারকে এভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা বোর্ড কর্মকর্তাদের নৈতিকতা ও আচরণবিধির চরম পরিপন্থী। কোয়াব স্পষ্ট করে বলেছে, তামিমের মতো কিংবদন্তিকে এমন অপমানজনক কথা বলা পুরো ক্রিকেট সমাজকে ছোট করার শামিল।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে বোর্ড কর্মকর্তাদের সাথে ক্রিকেটারদের দূরত্ব বা দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। তবে একজন বর্তমান বোর্ড পরিচালক কর্তৃক দেশের সফলতম ব্যাটসম্যানকে বিদেশি এজেন্ট হিসেবে আখ্যা দেওয়াটা শিষ্টাচারের সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।

বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কোনো পরিচালক প্রকাশ্য মাধ্যমে ক্রিকেটারদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করতে পারেন না। এই ইস্যুতে যেভাবে বর্তমান ক্রিকেটাররা সিনিয়র তামিমের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা বিসিবি প্রশাসনের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিসিবির ভাবমূর্তি এতে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, বিশেষ করে যখন ভেন্যু পরিবর্তনের মতো স্পর্শকাতর কূটনৈতিক বিষয় আলোচনায় রয়েছে।

তামিম ইকবাল এখন পর্যন্ত এই নোংরা বিতর্কের কোনো সরাসরি উত্তর দেননি। তবে ক্রিকেটপ্রেমীরা মনে করছেন, মাঠের বাইরে এমন কাদা ছোড়াছুড়ি দেশের ক্রিকেটের জন্য অশনিসংকেত। বিসিবি প্রধান বা বোর্ড যদি নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেয়, তবে ক্রিকেটার ও কর্মকর্তাদের মধ্যকার এই আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। ক্রিকেট সমর্থকদের এখন একটাই দাবি কমা জাতির গৌরব বয়ে আনা ক্রিকেটারদের সম্মান রক্ষা করা হোক এবং ক্ষমতার চেয়ারে বসে দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

জেএইচআর