বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবথেকে জমকালো আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) মধ্যকার ক্ষমতার লড়াই ও আদর্শিক দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিসিবি এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে, যখন জানা যায় আজকের সূচিতে থাকা দ্বিতীয় ম্যাচটিও মাঠে গড়াচ্ছে না। এরপরই বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের জানিয়ে দেয়, আপাতত বিপিএলের বল আর মাঠে গড়াবে না।
সংকটের মূলে যা ছিল পুরো অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বিসিবি পরিচালক ও অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান এম নাজমুল ইসলাম। তাঁর সাম্প্রতিক বেশ কিছু মন্তব্য ক্রিকেটারদের সম্মানে চরম আঘাত হেনেছে বলে অভিযোগ ওঠে। ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিয়ে যখন রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে, তখন নাজমুল ইসলাম মন্তব্য করেন, ক্রিকেটাররা যদি ভালো পারফর্ম করতে না পারে, তবে তাদের পেছনে ব্যয় করা কোটি কোটি টাকা ফেরত চাওয়া উচিত।
এছাড়া জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘ভারতীয় দালাল’ লিখে চরম বিতর্কের জন্ম দেন তিনি। এক পর্যায়ে তিনি দম্ভোক্তি করে বলেন, বোর্ড না থাকলে ক্রিকেটাররা থাকবে কি না। এই মন্তব্যগুলোকে চরম অবমাননাকর আখ্যা দিয়ে আন্দোলনে নামে ক্রিকেটাররা।
যখন খেলা গৌণ হয়ে দাঁড়ালো আজ বৃহস্পতিবার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে দুটি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। দুপুরে ‘নোয়াখালী এক্সপ্রেস’ ও ‘চট্টগ্রাম রয়্যালস’ এবং সন্ধ্যায় ‘সিলেট টাইটানস’ বনাম ‘রাজশাহী ওয়ারিয়রস’। কিন্তু কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুনের নেতৃত্বে ক্রিকেটাররা সাফ জানিয়ে দেন, নাজমুল ইসলামের পদত্যাগ অথবা তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত তাঁরা মাঠে নামবেন না।
দুপুরে ক্রিকেটাররা তাঁদের অবস্থানে অনড় থাকার ঘোষণা দিয়ে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। মিঠুন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমরা খেলার বিরুদ্ধে নই, আমরা আমাদের সম্মানের পক্ষে। পরিচালক নাজমুল ইসলামকে হয় পদত্যাগ করতে হবে, নয়তো বোর্ডকে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে তিনি আর দায়িত্বে থাকছেন না। আমাদের সম্মান আগে, তারপর খেলা।
বিসিবির অব্যাহতি কার্ড ও স্থগিতাদেশের নাটক পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকেলে বিসিবি এক জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নাজমুল ইসলামকে অর্থ কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম নিজেই সেই কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বিসিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাঁরা ক্রিকেটারদের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তবে বিসিবির এই অব্যাহতির কৌশলে সন্তুষ্ট হতে পারেননি ক্রিকেটাররা। তাদের দাবি ছিল, নাজমুল ইসলামকে শুধু একটি কমিটি থেকে সরানো নয়, বরং বোর্ডের পরিচালক পদ থেকেই তাঁর চূড়ান্ত অপসারণ অথবা স্থায়ী পদত্যাগ।
বিসিবি পাল্টা অবস্থান নেয়, যদি নাজমুলকে সরাবার পরও ক্রিকেটাররা আজ মাঠে না নামেন, তবে বিপিএল বন্ধ করে দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটাররা মাঠে না নামায় এবং বোর্ড তাদের একরোখা অবস্থানে অটল থাকায় বিপিএল স্থগিতের পথে হাঁটে।
বিপিএল স্থগিতের প্রভাব ও ক্রিকেটাঙ্গনের ক্ষতি বিপিএল স্থগিত হওয়ার ফলে দেশের ক্রিকেট বিশাল এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল। এর ফলে প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি কোটি কোটি টাকা লগ্নি করে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। স্পন্সর এবং সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিশাল লোকসানের সম্মুখীন হবে।
এছাড়া বিদেশি ক্রিকেটাররা বাংলাদেশে বিপিএল খেলতে আসায় মাঝপথে টুর্নামেন্ট বন্ধ হওয়ায় বিসিবির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হলো। আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে বিপিএল ছিল ক্রিকেটারদের প্রস্তুতির অন্যতম মঞ্চ। খেলা বন্ধ হওয়ায় খেলোয়াড়দের ম্যাচ প্র্যাকটিসে বড় ঘাটতি তৈরি হবে।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম এখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখে। একদিকে প্রভাবশালী পরিচালক নাজমুল ইসলাম, অন্যদিকে মাঠের প্রাণ ভ্রমরা ক্রিকেটাররা। এই দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে বন্ধ হয়ে গেল বিপিএল।
এখন প্রশ্ন হলো, ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম শেষে যদি সমাধান না আসে, তবে কি ঘরোয়া ক্রিকেটের এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে?
ক্রিকেট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিসিবির উচিত ছিল শুরুতেই নাজমুল ইসলামের বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়া নিশ্চিত করা অথবা তাকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা। সেটি না হওয়ায় আজ মাঠের লড়াই মাঠের বাইরে চলে গেল।
বিপিএল স্থগিত হওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ক্রিকেটারদের মর্যাদা ও বোর্ডের প্রশাসনিক দম্ভের এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হারল ক্রিকেট এবং অগণিত ক্রিকেট ভক্ত। এখন সবার অপেক্ষা, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় কোনো অলৌকিক কিছু ঘটে কি না।
জেএইচআর