বিপিএলের আকাশ জয় করল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স, রেকর্ড প্রাইজমানি আর শরীফুলের অনন্য ইতিহাস

ক্রীড়া প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০১:৩২ পিএম

মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গত রাতে জ্বলে উঠেছিল হাজারো আলোর রোশনাই। আতশবাজির ঝলকানি আর গ্যালারিভর্তি দর্শকের গগনবিদারী চিৎকারের মধ্য দিয়ে পর্দা নামল বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ১২তম আসরের। নতুন ইতিহাস লিখে চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় তুলল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। ফাইনালে চট্টগ্রাম রয়্যালসকে ৬৩ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিপিএলের শিরোপা ঘরে তুলেছে তারা।

টুর্নামেন্ট শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রাইজমানির যে ছড়াছড়ি দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চ্যাম্পিয়ন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সেরাদের তালিকায় ছিল চমক আর প্রাপ্তির সমীকরণ।

ঘরে গেল ২ কোটি ৭৫ লাখ টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছিল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। লিগ পর্বে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থেকেই তারা প্লে-অফে পা রেখেছিল। যদিও প্রথম কোয়ালিফায়ারে হেরে কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল তারা, তবে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফাইনালের টিকিট কাটে। আর গতকালের মহাফাইনালে চট্টগ্রামের বোলারদের শাসন করে শিরোপা নিশ্চিত করে তারা। বিপিএলে নিজেদের প্রথম আসরেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য কীর্তি গড়া এই ফ্র্যাঞ্চাইজিটি প্রাইজমানি হিসেবে পেয়েছে মোটা অংকের ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, রানার্সআপ হওয়া চট্টগ্রাম রয়্যালস জিতেছে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে মালিকানা সংকটে পড়া দলটির দায়িত্ব নিয়েছিল বিসিবি। সেখান থেকে উঠে এসে ফাইনাল খেলা চট্টগ্রামের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি হিসেবেই দেখছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।

৫ লাখ টাকার পুরস্কার ফাইনাল ম্যাচে রাজশাহীর বড় সংগ্রহের মূল কারিগর ছিলেন ওপেনার তানজিদ হাসান। টুর্নামেন্টের আগের ১২ ম্যাচে খুব একটা ছন্দে না থাকলেও, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনে তিনি জ্বলে উঠলেন বিধ্বংসী রূপে। তুলে নিলেন দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি। এর মাধ্যমে তিনি ক্রিস গেইল ও তামিম ইকবালের পর বিপিএল ফাইনালের ইতিহাসে তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড গড়লেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশি হিসেবে বিপিএলে তিনটি সেঞ্চুরি করার একক রেকর্ডও এখন তাঁর ঝুলিতে। ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তিনি পেয়েছেন ৫ লাখ টাকা।

সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক পারভেজ হোসেন পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতার প্রতিমূর্তি ছিলেন পারভেজ হোসেন। সিলেট টাইটানসের হয়ে খেলা এই তরুণ ব্যাটসম্যান ১২ ম্যাচে ৩টি হাফ-সেঞ্চুরিসহ করেছেন মোট ৩৯৫ রান। ১৩২.৯৯ স্ট্রাইক রেটে রান তুলে তিনি এবারের আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক (অরেঞ্জ ক্যাপ) হয়েছেন। দল ফাইনালে না উঠলেও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন ৫ লাখ টাকা।

টুর্নামেন্ট সেরার মুকুট এবারের বিপিএলে বল হাতে একাই তাণ্ডব চালিয়েছেন পেসার শরীফুল ইসলাম। গত আসরে তাসকিন আহমেদের ২৫ উইকেটের রেকর্ড ভেঙে দিয়ে তিনি গড়েছেন নতুন ইতিহাস। ১২ ম্যাচে ২৬ উইকেট নিয়ে তিনি কেবল এবারের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিই হননি, বরং বিপিএল ইতিহাসের এক আসরে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিকও এখন তিনি।

রেকর্ড গড়া এই পারফরম্যান্সের জন্য সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হিসেবে শরীফুল পেয়েছেন ৫ লাখ টাকা। তবে সবচেয়ে বড় চমক ছিল টুর্নামেন্ট সেরার (এমভিপি) পুরস্কারে। বিপিএলের ইতিহাসে এর আগে কোনো বিশেষজ্ঞ পেসার টুর্নামেন্ট সেরা হতে পারেননি। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শরীফুল ইসলাম জিতে নিয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার, যার জন্য তিনি পেয়েছেন আরও ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ টুর্নামেন্ট শেষে তাঁর মোট প্রাপ্তি ১৫ লাখ টাকা।

উদীয়মান তারকা রিপন মণ্ডল ও সেরা ফিল্ডার লিটন রাজশাহী ওয়ারিয়র্সকে চ্যাম্পিয়ন করার নেপথ্যে তরুণ পেসার রিপন মণ্ডলের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ৮ ম্যাচে ১৭ উইকেট শিকার করার পাশাপাশি টুর্নামেন্টে হ্যাটট্রিকও করেছেন তিনি। এমনকি একটি সুপার ওভারে স্নায়ুর চাপ জয় করে দলকে জিতিয়েছিলেন এই তরুণ। ফলে এবারের আসরের 'ইমার্জিং প্লেয়ার' বা উদীয়মান খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন ৩ লাখ টাকা।

মাঠে অসাধারণ ক্ষিপ্রতা দেখিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা ফিল্ডারের পুরস্কার জিতেছেন লিটন দাস। উইকেটকিপিং গ্লাভস ছেড়ে এবার তিনি রংপুর রাইডার্সের হয়ে ফিল্ডার হিসেবে খেলেন। ১১ ম্যাচে অবিশ্বাস্য ১০টি ক্যাচ তালুবন্দি করে তিনি জেতেন ৩ লাখ টাকা।

বিপিএল ২০২৬-এর পুরস্কারের আর্থিক চিত্র অনুযায়ী, চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী ওয়ারিয়র্স ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং রানার্সআপ চট্টগ্রাম রয়্যালস ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা পেয়েছে। টুর্নামেন্ট সেরা হিসেবে শরীফুল ইসলাম ১০ লাখ টাকা ও সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হিসেবে ৫ লাখসহ মোট ১৫ লাখ টাকা জিতেছেন। ফাইনালে ম্যাচসেরা তানজিদ হাসান ৫ লাখ টাকা, সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক পারভেজ হোসেন ৫ লাখ টাকা, উদীয়মান খেলোয়াড় রিপন মণ্ডল ৩ লাখ টাকা এবং সেরা ফিল্ডার লিটন দাস ৩ লাখ টাকা পুরস্কার পেয়েছেন।

বিপিএলের ১২তম আসরটি বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেকগুলো নতুন প্রতিভার জন্ম দিয়েছে। তরুণ ক্রিকেটারদের এই দাপট জাতীয় দলের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজশাহীর শিরোপা উল্লাস আর শরীফুল-তানজিদদের ব্যক্তিগত মাইলফলক মিলিয়ে বিপিএল ২০২৬ স্মরণীয় হয়ে থাকবে ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে।

জেএইচআর