বিশ্ব ক্রিকেটে ডামাডোল যেন থামছেই না। একদিকে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের তীব্র হুমকি, অন্যদিকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দল ঘোষণা এমনই এক নাটকীয় পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। আইসিসির দ্বি-চারিতা আর দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটীয় ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েনের মাঝে আজ রোববার সকালে ১৫ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণা করেছে পাকিস্তান।
লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে পিসিবির নির্বাচক প্যানেলের সদস্য আকিব জাভেদ এই দল ঘোষণা করেন। তবে দল ঘোষণার চেয়েও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আইসিসি ও বিসিবির মধ্যকার সংঘাত এবং তাতে পাকিস্তানের অবস্থান।
২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল আয়োজক দেশগুলোর একটি ভারত। কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা ভারতে দল পাঠাবে না। এই অনড় অবস্থানের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেয়। তারা বাংলাদেশের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করে।
আইসিসির এই সিদ্ধান্তকে 'চরম বৈষম্যমূলক' ও 'দ্বিমুখী নীতি' বলে অভিহিত করেছে পাকিস্তান। পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি গতকালই কড়া হুশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ যদি নিরাপত্তার কারণে খেলতে না পারে এবং আইসিসি যদি নমনীয় না হয়, তবে পাকিস্তানও এই বিশ্বকাপ বর্জনের কথা গুরুত্বের সাথে ভাবছে। কিন্তু সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই আজ আকস্মিকভাবে দল ঘোষণা করল পাকিস্তান।
ঘোষিত ১৫ সদস্যের দলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা হলো অভিজ্ঞ উইকেটকিপার ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ান এবং গতিদানব হারিস রউফের অনুপস্থিতি। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে কেন রাখা হয়নি, তা নিয়ে ক্রিকেট মহলে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে। তবে নির্বাচক আকিব জাভেদ জানিয়েছেন, দলের ভারসাম্য রক্ষা এবং নতুনদের সুযোগ দিতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত।
নতুন অধিনায়ক: বাবর আজম দলে থাকলেও তাঁর কাঁধে নেই নেতৃত্বের ভার। সালমান আগার নেতৃত্বে এক নতুন চেহারার পাকিস্তান লড়বে বিশ্বমঞ্চে।
অভিষিক্তের ছড়াছড়ি: অধিনায়ক সালমান আগাসহ ফাহিম আশরাফ, খাজা নাফি, সালমান মির্জা, সাহিবজাদা ফারহান ও উসমান তারিক এই ছয়জন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের স্বাদ পেতে যাচ্ছেন।
নতুনদের ভিড়ে বাবর আজম, ফখর জামান, নাসিম শাহ, শাহিন শাহ আফ্রিদি এবং শাদাব খানের মতো অভিজ্ঞরা দলের মেরুদণ্ড হিসেবে থাকছেন। বিশেষ করে শাহিন ও নাসিমের পেস আক্রমণ এবং শাদাব-আবরারের স্পিন ঘূর্ণির ওপর ভরসা রাখছে পাকিস্তান।
সালমান আগা (অধিনায়ক), বাবর আজম, ফখর জামান, শাহিন শাহ আফ্রিদি, শাদাব খান, নাসিম শাহ, আবরার আহমেদ, ফাহিম আশরাফ, খাজা নাফি, মোহাম্মদ নেওয়াজ, সালমান মির্জা, সাহিবজাদা ফারহান, সাইম আইয়ুব, উসমান খান ও উসমান তারিক।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, পিসিবির এই দল ঘোষণা একটি 'কূটনৈতিক চাল' হতে পারে। একদিকে তারা বর্জনের হুমকি দিয়ে আইসিসিকে চাপে রাখছে, অন্যদিকে দল ঘোষণা করে আইনি ও প্রযুক্তিগতভাবে টুর্নামেন্টের প্রস্তুতিও সচল রাখছে। মহসিন নাকভি জানিয়েছিলেন যে, সরকারের সবুজ সংকেত পেলেই তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। দল ঘোষণা হলেও পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত বিমানে উঠবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
যদি সব অনিশ্চয়তা কেটে যায়, তবে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ মিশন শুরু হওয়ার কথা। গ্রুপ ‘এ’-তে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত, নামিবিয়া ও স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র।
ভারতের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি ঘিরে এখন থেকেই উত্তেজনা তুঙ্গে, তবে তার আগে বিসিবি-আইসিসি-পিসিবি ত্রিভুজ প্রেমের এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, তাই দেখার বিষয়।
বাংলাদেশের সাথে হওয়া ‘অন্যায়ের’ প্রতিবাদে পাকিস্তান যেভাবে সরব হয়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটে এক নতুন ঐক্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে রিজওয়ান-রউফ বিহীন এই 'কোমল' দল নিয়ে পাকিস্তান বিশ্বজয়ের স্বপ্ন কতটুকু পূরণ করতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই মাঠের বাইরের এই লড়াই এখন বিশ্ব ক্রিকেটের প্রধান শিরোনাম।
এএন