টসে জিতে ভারত যখন ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শকের মনে ছিল একটাই প্রত্যাশা, বড় স্কোর। কিন্তু শুরুটা যেমনই হোক না কেন, ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় যখন হ্যারি ব্রুক ভারতের ইনফর্ম ব্যাটার সঞ্জু স্যামসনের একটি সহজ ক্যাচ ফেলে দেন। তখন স্যামসনের ব্যক্তিগত রান ছিল মাত্র ১৫।
সেই একটি জীবন পাওয়ার পর স্যামসন যে তাণ্ডব চালালেন, তা ইংল্যান্ডের বোলারদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। মাঠের চারদিকে স্ট্রোকের ফুলঝুরি ছুটিয়ে তিনি ৪২ বলে ৮৯ রানের এক অনবদ্য ইনিংস খেলেন। তাঁর এই ইনিংসের ওপর ভিত্তি করেই ভারত ২৫৩ রানের বিশাল এক পাহাড় গড়ে তোলে। সঞ্জুর ইনিংসটি সাজানো ছিল চোখধাঁধানো সব বাউন্ডারি আর আকাশচুম্বী ছক্কায়।
সঞ্জু স্যামসনের বিদায়ের পর তিলক বর্মা, শিবম দুবে এবং হার্দিক পান্ডিয়াদের ছোট কিন্তু কার্যকরী ক্যামিও ভারতকে রেকর্ড গড়া স্কোরে নিয়ে যায়। ২০ ওভার শেষে ভারত ৭ উইকেটে ২৫৩ রান সংগ্রহ করে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত বিশাল রান তাড়া করে জেতার কোনো নজির এর আগে ছিল না।
২৫৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ডের শুরুটা খুব একটা ভালো না হলেও, তিন নম্বরে নামা জ্যাকব বেথেল ম্যাচের চিত্রপট বদলে দেন। যেখানে পুরো ইংল্যান্ড দল চাপে পিষ্ট হওয়ার কথা, সেখানে বেথেল যেন অন্য কোনো গ্রহের ব্যাটিং করছিলেন। মাত্র ৪৮ বলে তিনি খেলেন ১০৫ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস। বেথেলের এই সেঞ্চুরিতে ছিল প্রতিটা শটের আত্মবিশ্বাস। মাত্র ১৯ বলে নিজের অর্ধশতক পূর্ণ করেন তিনি।
মজার বিষয় হলো, ভারত যেখানে তাদের প্রথম ১০০ রান করতে ৮.৩ ওভার সময় নিয়েছিল, বেথেলের কল্যাণে ইংল্যান্ড তা করে ফেলে মাত্র ৮.১ ওভারে।
উইল জ্যাকস যখন ক্রিজে এলেন, তখন মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ড হয়তো অসম্ভবকে সম্ভব করতে চলেছে। দুজনের ৩৯ বলে ৭৭ রানের ঝোড়ো জুটি ভারতকে রীতিমতো ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছিল। গ্যালারির ভারতীয় সমর্থকদের মধ্যে পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছিল। কিন্তু সেই নীরবতা ভাঙলেন ভারতের গেমচেঞ্জার অক্ষর প্যাটেল।
ক্রিকেটে একটি জনপ্রিয় কথা আছে, ক্যাচেস উইন ম্যাচেস। এই ম্যাচটি ছিল সেই প্রবাদের উজ্জ্বল উদাহরণ। ভারতের এই জয়ের পেছনে ব্যাটারদের চেয়ে কোনো অংশে কম অবদান নেই ফিল্ডারদের, বিশেষ করে অক্ষর প্যাটেলের।
ম্যাচের তিনটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল হ্যারি ব্রুকের মিস, যেখানে স্যামসনের ক্যাচ মিস করে ইংল্যান্ড ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়ার বীজ বপন করে। এরপর পাওয়ার প্লে চলাকালীন হ্যারি ব্রুকের একটি কঠিন ক্যাচ ৩০ গজ থেকে দৌড়ে গিয়ে সীমানার কাছে তালুবন্দি করেন অক্ষর প্যাটেল। সর্বশেষ টার্নিং পয়েন্ট ছিল সীমানায় অ্যাক্রোবেটিক ক্যাচ।
উইল জ্যাকস যখন থিতু হয়ে ম্যাচ বের করে নিচ্ছিলেন, তখন বাউন্ডারি লাইনে অবিশ্বাস্য এক ফিল্ডিং প্রদর্শন করেন অক্ষর। বলটি হাতে ধরে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি সেটি শিবম দুবের দিকে ছুঁড়ে দেন। যদিও স্কোরকার্ডে ক্যাচটি দুবের নামে লেখা, কিন্তু এর প্রকৃত কারিগর ছিলেন অক্ষর প্যাটেল।
শেষ ৩ ওভারে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ছিল ৪৫ রান। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এই সমীকরণ এখন খুব একটা কঠিন নয়, বিশেষ করে যখন বেথেল উইকেটে সেট ছিলেন। কিন্তু ১৮তম ওভারে বল করতে এসে যশপ্রীত বুমরা ম্যাচের দৃশ্যপট বদলে দেন। সেই ওভারে তিনি খরচ করেন মাত্র ৬ রান।
বুমরার এই স্পেলটি ছিল নিখুঁত ইয়র্কার আর স্লোয়ারের মিশ্রণ, যা ইংল্যান্ডের জয়ের আশাকে সমীকরণের বেড়াজালে আটকে ফেলে। অন্যদিকে, অপর প্রান্তে থাকা স্যাম কারেন ঠিক সেই গতিতে রান তুলতে ব্যর্থ হন। তিনি ১৪ বলে করেন মাত্র ১৮ রান, যা কার্যত ইংল্যান্ডের ওপর চাপ বাড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়েও ইংল্যান্ড ২৪৬ রানে থামে এবং ভারত ৭ রানে জয় পায়।
সেমিফাইনালের এই রুদ্ধশ্বাস জয় ভারতকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে চতুর্থবারের মতো ফাইনালে নিয়ে গেল। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড। কিউইরা গত ৪ মার্চ ফিন অ্যালেনের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করেছিল। ৮ মার্চের সেই মেগা ফাইনালে ক্রিকেট ভক্তরা এখন মুখিয়ে আছেন।
ভারতের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে, বিশেষ করে স্যামসনের ফর্ম আর বুমরা ও অক্ষরদের দুর্দান্ত ফিল্ডিং ও বোলিং নৈপুণ্য ভারতকে ফেবারিট হিসেবেই এগিয়ে রাখছে। জ্যাকব বেথেলের ১০৫ রানের ইনিংসটি হয়তো বৃথা গেছে, কিন্তু এটি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ইনিংস হিসেবে বিবেচিত হবে।
অন্যদিকে, ভারত প্রমাণ করেছে কেন তারা শিরোপার অন্যতম দাবিদার। ব্যক্তিগত প্রতিভা বনাম দলীয় সংহতির এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত সংহতি আর ফিল্ডিংয়ের দক্ষতাই ভারতকে ফাইনালের টিকিট এনে দিল। ভারতের লক্ষ্য এখন একটিই, মুম্বাইয়ের এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তোলা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ভারত: ২৫৩/৭ (২০ ওভার), সঞ্জু স্যামসন ৮৯ (৪২)
ইংল্যান্ড: ২৪৬/৮ (২০ ওভার), জ্যাকব বেথেল ১০৫ (৪৮)
ফলাফল: ভারত ৭ রানে জয়ী।
ম্যাচ সেরা: সঞ্জু স্যামসন।