তামিম-মিরাজ রসায়নে ক্রিকেটে নতুন যুগের স্বপ্ন

ক্রীড়া প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

বাংলাদেশ ক্রিকেটে গত কয়েক দিন ধরে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। মাঠের ক্রিকেটের চেয়েও বেশি আলোচনা চলছে বিসিবির প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে। তবে এই পরিবর্তনের মাঝেও খেলোয়াড়দের মধ্যে এক ধরণের স্বস্তি কাজ করছে, যার মূল কারণ বোর্ডের শীর্ষ পদে একজন সাবেক ক্রিকেটারের আসীন হওয়া। 

বৃহস্পতিবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ সেই স্বস্তির কথাই ব্যক্ত করলেন।

বিসিবির অ্যাডহক কমিটির নবনিযুক্ত সভাপতি তামিম ইকবালের অধীনে কাজ করা এবং বর্তমান দলগত পরিস্থিতি নিয়ে মিরাজের কণ্ঠে ঝরেছে আশাবাদ। তিনি মনে করেন, তামিম ইকবালের মতো একজন অভিজ্ঞ এবং সাম্প্রতিক সময়ের ক্রিকেটার সভাপতির দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এক অনন্য ইতিবাচক দিক।

বেশি দিন আগের কথা নয়, ২০২৩ সালেও তামিম ইকবাল ছিলেন জাতীয় ওয়ানডে দলের নিয়মিত অধিনায়ক। এমনকি মাত্র এক বছর আগে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে মোহামেডানের জার্সিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন তামিম ও মিরাজ। সময়ের বিবর্তনে আজ মিরাজ ওয়ানডে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আর গত ৭ এপ্রিল থেকে আগামী তিন মাসের জন্য বিসিবির অ্যাডহক কমিটির সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন করছেন তামিম।

সতীর্থ থেকে সভাপতির এই রূপান্তরকে মিরাজ দেখছেন খেলোয়াড়দের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে। তিনি বলেন, যেহেতু আমরা একসঙ্গে ক্রিকেট খেলেছি, তিনি আমাদের সম্পর্কে বেশি ভালো জানবেন। উনি যেহেতু সাম্প্রতিক সময়ে খেলা ছেড়েছেন, আমাদের কী চাহিদা আছে, আমরা কী পছন্দ করি, তা ওনার নখদর্পণে। এটি খেলোয়াড়দের জন্য অনেক বড় একটি ইতিবাচক দিক।

সাধারণত ক্রিকেট বোর্ডে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে খেলোয়াড়দের চাহিদার একটি অদৃশ্য দূরত্ব থাকে। কিন্তু মিরাজ মনে করেন, তামিম সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দেবেন। কারণ তামিম নিজেও খুব সম্প্রতি মাঠের লড়াই শেষ করে ড্রেসিংরুম ছেড়ে এসেছেন। ফলে খেলোয়াড়দের মনস্তত্ত্ব এবং মাঠের বাইরের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা অন্যদের চেয়ে সমৃদ্ধ।

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তামিম ইকবাল প্রমাণ করেছেন তিনি কেবল নামেই সভাপতি নন। গত এক সপ্তাহে তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটের মানোন্নয়নে বেশ কিছু বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ঘরোয়া ক্রিকেটারদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো এবং প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি বৃদ্ধি করা।

মিরাজ এই উদ্যোগগুলোকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, ঘরোয়া ক্রিকেট আমাদের পাইপলাইনের মূল ভিত্তি। সেখানে যখন সভাপতি সরাসরি নজর দেন এবং ক্রিকেটারদের আর্থিক অবস্থার কথা চিন্তা করেন, তখন মাঠের পারফরম্যান্সেও এর প্রতিফলন দেখা যাবে। ক্রিকেটাররা এখন আরও বেশি অনুপ্রাণিত বোধ করছেন।

নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে তামিম ইকবালের সঙ্গে জাতীয় দলের সিনিয়র ও জুনিয়র ক্রিকেটারদের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। সেই আলোচনায় কোনো চাপ নয়, বরং ইতিবাচক প্রেরণা পেয়েছেন বলে জানান ওয়ানডে অধিনায়ক। মিরাজ বলেন, সভাপতির সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছিল। তিনি স্বীকার করেছেন যে আমাদের দল বর্তমানে ভালো ছন্দ আছে। তিনি আমাদের স্রেফ একটি বার্তাই দিয়েছেন, আমরা যেভাবে ইতিবাচক ক্রিকেট খেলছি, সেটি যেন বজায় রাখি।

তামিমের এই 'হ্যান্ডস-অফ' অ্যাপ্রোচ বা ক্রিকেটারদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখাটা দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। মিরাজ মনে করেন, সভাপতি যখন নিজে একজন লিজেন্ডারি ক্রিকেটার হন, তখন তাঁর ছোট একটি বাহবাও ড্রেসিংরুমের আবহাওয়া বদলে দেয়।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত ব্যস্ত সময়। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আসন্ন সাদা বলের (ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি) সিরিজ নিয়ে এখন মিরপুর মুখর। ট্রফি উন্মোচন অনুষ্ঠানে দুই দলের অধিনায়কের উপস্থিতিতে লড়াইয়ের আবহ ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে, আগামী মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজ।

মিরাজ জানান, গত এক সপ্তাহের প্রশাসনিক ডামাডোলের মধ্যেও ক্রিকেটাররা মাঠের অনুশীলনে একচুলও ছাড় দেননি। সাদা বল এবং লাল বলের ক্রিকেটারদের জন্য আলাদা আলাদা অনুশীলন সেশন পরিচালিত হয়েছে। কিউইদের বিপক্ষে হোম সিরিজে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে মরিয়া মিরাজ বাহিনী।

অধিনায়ক আরও যোগ করেন, আমাদের লক্ষ্য পরিষ্কার। ঘরের মাঠে আমরা সবসময়ই শক্তিশালী। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে আমরা আমাদের সেরাটা দিয়ে লড়ব। সভাপতির দিক থেকে আমরা পূর্ণ সমর্থন পাচ্ছি, এখন আমাদের দায়িত্ব মাঠে সেই আস্থার প্রতিদান দেওয়া।

তামিম ইকবালের নিয়োগের পর থেকে বিসিবির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমেও গতি এসেছে। গত এক সপ্তাহে বিসিবি কার্যালয়ে ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে তামিম ইকবালের এই সংক্ষিপ্ত মেয়াদ বাংলাদেশ ক্রিকেটে কোনো স্থায়ী কাঠামোর রূপরেখা দিয়ে যায় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে মিরাজের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, খেলোয়াড়রা এই 'ক্রিকেটীয় মস্তিষ্কের' নেতৃত্বে অত্যন্ত সাবলীল ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।

মেহেদী হাসান মিরাজের নেতৃত্বে তরুণ এই বাংলাদেশ দল এখন নতুন এক শুরুর অপেক্ষায়। পেছনে একজন অভিজ্ঞ ‘বড় ভাই’ বা ‘মেন্টর’ হিসেবে তামিম ইকবালের প্রশাসনিক ছায়া দলকে আরও সংহত করেছে। মিরপুরের সবুজ ঘাসে কিউইদের বিপক্ষে লড়াইয়ে নামার আগে মিরাজের এই আত্মবিশ্বাসই হতে পারে বাংলাদেশের জয়ের মূল চাবিকাঠি। ভক্তদের প্রত্যাশা, মাঠের অধিনায়ক আর বোর্ডের সভাপতির এই চমৎকার বোঝাপড়া বাংলাদেশ ক্রিকেটকে নিয়ে যাবে নতুন উচ্চতায়।

এম জি