ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের আনন্দ উদযাপন করতে গিয়ে ফ্রান্সজুড়ে সহিংসতা ও দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। ফরাসি ক্লাব (পিএসজি) ফাইনালে আর্সেনাল এফসি-কে পরাজিত করার পর দেশজুড়ে সংঘর্ষে অন্তত ২১৯ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে আটজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোরাঁ নুনিয়েজ।
শনিবার রাতভর চলা সহিংস ঘটনায় পুলিশ মোট ৭৮০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের মধ্যে ৪৫০ জনেরও বেশি এখনও হেফাজতে রয়েছে। সংঘর্ষে ৫৭ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। রাজধানী প্যারিস-সহ বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় হাজার হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।
পিএসজির জয়ের পর হাজার হাজার সমর্থক প্যারিসের বিখ্যাত শঁজ এলিজে সড়কে জড়ো হন। শুরুতে আনন্দ-উল্লাস থাকলেও পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিভিন্ন স্থানে আতশবাজি ও ফ্লেয়ার জ্বালানো হয়, সড়কে বৈদ্যুতিক মোটরবাইকে আগুন দেওয়া হয় এবং অন্তত একটি দোকানের কাচ ভাঙচুর করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে। সহিংসতার কারণে রাজধানীর বাস, ট্রেন ও রেল পরিষেবাও ব্যাহত হয়।
প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানী থেকেই ৪৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৭৭ জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৮২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
প্যারিসের প্রসিকিউটর অফিস জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলা, সম্পত্তি নষ্ট করা, চুরি এবং অবৈধ অস্ত্র বহনের মতো অভিযোগ রয়েছে। তবে তদন্ত এখনও চলমান থাকায় এই সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
দাঙ্গার সময় প্যারিসের রিং রোডের কাছে পোর্তো মাইয়ো এলাকায় ২৪ বছর বয়সী এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তিনি মোটরসাইকেল চালানোর সময় কংক্রিটের ব্যারিয়ারে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। তবে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয়।
এছাড়া প্যারিসের অন্য একটি এলাকায় মারামারির ঘটনায় এক কিশোর গুরুতর আহত হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে। তার সঙ্গে ফুটবল-সংক্রান্ত দাঙ্গার সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ বলেছেন, অধিকাংশ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন করলেও কিছু ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে মাঠে নেমেছে।
তিনি বলেন, বেশিরভাগ মানুষ আনন্দ উদযাপন করতে বের হয় এবং সবকিছু ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়। কিন্তু কিছু ব্যক্তি, যারা প্রকৃতপক্ষে পিএসজির সমর্থকও নয় এবং ম্যাচও দেখে না, তারা শুধুমাত্র অরাজকতা সৃষ্টির জন্য রাস্তায় নামে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর।
তিনি আরও বলেন, ফ্রান্স জনশৃঙ্খলা রক্ষায় সক্ষম একটি দেশ। আমরা মানুষের সমাবেশ ও উদযাপনের স্বাধীনতাকে সম্মান করি, কিন্তু সহিংসতা ও বাড়াবাড়ি মেনে নেওয়া হবে না।
ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুধু ফ্রান্সেই একটি ফুটবল ক্লাবের জয় দাঙ্গার কারণ হতে পারে।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, শুধু ফ্রান্সেই মানুষকে একটি জয়ের রাতেও সহিংসতার ভয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকতে হয়।
রোববার পিএসজির খেলোয়াড়দের নিয়ে বিজয় মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। তারা প্যারিসের আইফেল টাওয়ার সংলগ্ন মার্সের মাঠ এলাকায় সমর্থকদের সঙ্গে উদযাপনে অংশ নেবেন।
এছাড়া দলের জন্য ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ -এর পক্ষ থেকেও সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে।
তবে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সরকার প্রায় ৬,০০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে। কর্তৃপক্ষের আশা, এবার উদযাপন শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হবে।
গত বছরও পিএসজির শিরোপা জয়ের পর একই ধরনের সহিংসতা দেখা গিয়েছিল, যেখানে উদযাপন শেষ পর্যন্ত প্রাণহানির ঘটনায় রূপ নেয়। ফলে এবারের পরিস্থিতি নিয়ে শুরু থেকেই প্রশাসন বিশেষ সতর্ক ছিল। তবুও বড় ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সহিংসতা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
ফ্রান্সজুড়ে এখন একদিকে পিএসজির ঐতিহাসিক জয়ের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ- দুই বিপরীত চিত্রই সামনে এসেছে।
এএন